বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হতে না হতেই মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক পড়েছে। প্রচার-প্রচারণার ডামাডোলে প্রার্থীরা যেন ভুলেই গেছেন আইনের সীমাবদ্ধতা। তবে নির্বাচন কমিশনও (ইসি) বসে নেই। গত এক মাসে সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে জরিমানার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ টাকারও বেশি।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) এবং নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব মো. সাইফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসব্যাপী অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মোট ৪৬১টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ২৫৯টি ঘটনায় সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, জরিমানার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা। প্রার্থীরা পোস্টার লাগানো থেকে শুরু করে জনসভা বা শোডাউনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমারেখা বারবার অতিক্রম করছেন। বিশেষ করে ৩ ফেব্রুয়ারি ছিল আইন লঙ্ঘনের দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত দিন। ওই এক দিনেই ৩৩টি নিয়ম ভঙ্গের ঘটনা ঘটে এবং ১৩টি মামলায় রেকর্ড ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
গত কয়েক দিনের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মাঠপর্যায়ে উত্তাপের পাশাপাশি নিয়ম ভাঙার প্রবণতাও বাড়ছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ২৮টি আইন ভঙ্গের ঘটনায় ১২টি মামলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর ঠিক পরদিন ৭ ফেব্রুয়ারি জরিমানার পরিমাণ এক লাফে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি আরও ৮৭ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক প্রার্থী প্রভাবশালী হওয়ার কারণে শুরু থেকেই আচরণবিধিকে তোয়াক্কা করছিলেন না। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই কঠোর অবস্থান ভোটারদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। বিশেষ করে দেয়ালে পোস্টার লাগানো, নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে মাইকিং করা এবং রঙিন ব্যানার ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোতে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই অভিযান কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রার্থীর বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই তৎপরতা। মো. সাইফুল ইসলাম তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই কার্যক্রম ভোটগ্রহণের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল জরিমানা দিয়েই এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তাদের কর্মীদের সচেতন করা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার বিকল্প নেই। তবে কমিশনের এই কঠোর পদক্ষেপে অনেক প্রার্থী এখন সতর্ক হতে শুরু করেছেন। রাজপথে পেশিশক্তি প্রদর্শন বা প্রভাব খাটানোর চেষ্টার বিপরীতে জরিমানার এই ‘কাগজে আঘাত’ নির্বাচনী সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের এই সন্ধিক্ষণে দেশজুড়ে যখন উৎসবের আবহ, তখন নির্বাচন কমিশনের এই সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে ভোটের পরিবেশ নিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে জরিমানার এই অঙ্ক আরও বাড়ে নাকি প্রার্থীরা আইনের পথে ফিরে আসেন।

