পবিত্র রমজান মাস কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এক আত্মিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মিলনমেলা। যদিও রোজা রাখা বা ইবাদতের মূল ভিত্তি সবখানে একই, কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস আর ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়ায় একেক দেশে রমজান পালনের চিত্র একেক রকম।
কোথাও আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে ফানুসের আলোয়, কোথাও আবার ভোরের নিস্তব্ধতা ভাঙে ঐতিহ্যবাহী ঢোলের শব্দে। সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যই রমজানকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচলিত রমজানের এমন ৭টি আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী রীতির গল্প আজ তুলে ধরা হলো:
১. কামানের গর্জনে ইফতারের সংকেত
ডিজিটাল ঘড়ি কিংবা লাউডস্পিকার আসার শত শত বছর আগে থেকে আরব দেশগুলোতে ইফতারের সময় জানানো হতো কামানের গোলা ছুড়ে। একে বলা হয় ‘মিদফা আল ইফতার’। লোককথা অনুযায়ী, মিসরে এক সুলতান ভুলবশত সূর্যাস্তের সময় কামানের পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, আর সাধারণ মানুষ তাকেই ইফতারের সংকেত ভেবে আনন্দিত হয়েছিল। সেই থেকে আজও সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোতে প্রাচীন এই ঐতিহ্য টিকে আছে।
২. মিসরের রাজপথে রঙিন ফানুস
রমজান এলেই কায়রোসহ মিসরের প্রতিটি গলি সেজে ওঠে ‘ফানুস’ বা হাতে তৈরি বিশেষ লণ্ঠনের আলোয়। দশম শতাব্দীতে ফাতিমীয় খলিফাকে স্বাগত জানাতে সাধারণ মানুষ মোমবাতি আর লণ্ঠন হাতে রাস্তায় নেমেছিল। সেই থেকে রঙিন কাঁচ আর ধাতুর তৈরি এই ফানুস হয়ে উঠেছে রমজানের অন্যতম বৈশ্বিক প্রতীক। এখন কেবল মিসর নয়, সারা বিশ্বের অনেক দেশেই রমজানের সাজসজ্জায় এই ফানুস ব্যবহার করা হয়।
৩. সেহরির ডাক আর ঐতিহ্যবাহী ঢোল
রমজানের গভীর রাতে যখন পুরো শহর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন একদল মানুষ ঢোল বাজিয়ে ছন্দময় কণ্ঠে গেয়ে চলেন সেহরির গান। তুরস্কে এদের বলা হয় ‘দাভুলচু’। তারা উসমানীয় আমলের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে রাস্তায় নামেন। একইভাবে আরব দেশগুলোতে ‘মেসাহারাতি’ এবং আমাদের এই উপমহাদেশে ‘সেহেরিওয়ালারা’ বংশপরম্পরায় এই সেবা দিয়ে আসছেন। প্রযুক্তির যুগেও এই মানবিক আবেগ ও সংস্কৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে আছে।
৪. মরক্কোর নগর ঘোষক: ‘নাফার’
মরক্কোর গলিগুলোতে সেহরির সময় ঢোলের বদলে ব্যবহৃত হয় দীর্ঘ শিঙা বা তূরী। ঐতিহ্যবাহী ‘গানদোরা’ পোশাক ও টুপি পরে ‘নাফার’ নামক এই ঘোষকরা পাড়া-মহল্লায় ঘুরে মানুষকে জাগিয়ে তোলেন। তাদের এই ছন্দোবদ্ধ ডাক আর সুর রমজানের রাতগুলোতে এক মরমী আবহের সৃষ্টি করে। মূলত বিশ্বস্ততা ও সততার প্রতীক হিসেবেই এই নাফারদের বেছে নেওয়া হয়।
৫. শিশুদের উৎসব ‘হাগ আল লায়লা’
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান আসার ১৫ দিন আগেই যেন উৎসব শুরু হয়ে যায়। শাবান মাসের ১৫ তারিখে পালিত হয় ‘হাগ আল লায়লা’। শিশুরা উজ্জ্বল রঙিন পোশাকে সজ্জিত হয়ে পাড়ার বাড়ি বাড়ি যায় এবং ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে মিষ্টি ও বাদাম সংগ্রহ করে। এটি মূলত শিশুদের মনে রমজানের প্রতীক্ষা আর দানশীলতার শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার একটি মিষ্টি মাধ্যম।
৬. ইন্দোনেশিয়ার ‘পাডুসান’ ও আত্মশুদ্ধি
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার জাভা অঞ্চলে রোজা শুরুর আগে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। সেখানকার মানুষ পবিত্র মাসকে স্বাগত জানাতে প্রাকৃতিক ঝরনা, নদী বা জলাশয়ে সম্মিলিতভাবে গোসল করেন। একে বলা হয় ‘পাডুসান’। এই গণ-স্নানের মূল উদ্দেশ্য হলো শরীর ও মনের শুদ্ধি ঘটিয়ে রমজানের ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। এছাড়া তারা রমজানের আগে পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা জানানোর রীতিও পালন করে।
৭. উৎসবের শেষ প্রহর: ‘চাঁদ রাত’
রমজান শেষ হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ যখন আসে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এক অন্যরকম উন্মাদনা দেখা দেয়। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার পর শুরু হয় ‘চাঁদ রাত’। নারীদের হাতে মেহেদি লাগানো, ঈদের শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা আর ঘরে ঘরে সেমাই তৈরির ধুম—সব মিলিয়ে এই রাতটি যেন এক বড় উৎসবে রূপ নেয়। এটি কেবল একটি রাত নয়, বরং দীর্ঘ এক মাসের সংযম শেষে আনন্দের এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

