দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কেবল একটিই আলোচনা—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে নয়, বরং ভারতের জন্য বাংলাদেশের সাথে ভেঙে পড়া সম্পর্ক জোড়া দেওয়ার এক ঐতিহাসিক ‘রিসেট বাটন’ হিসেবে দেখছেন প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক ও ‘দ্য প্রিন্ট’-এর প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত। তার মতে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সাম্প্রতিক তিক্ততা দূর করে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরির এটিই হতে পারে মোক্ষম সুযোগ।
শেখর গুপ্ত তার নিয়মিত কলাম ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’-এ উল্লেখ করেছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশে একটি নতুন নির্বাচিত সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এটি নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা। তিনি মনে করেন, ভারতের রাজ্য নির্বাচনগুলোতে প্রায়শই ব্যবহৃত ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘ঘুষপেটিয়া’র মতো কঠোর শব্দমালা কমিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে একটি মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্লেষণ করতে গিয়ে শেখর গুপ্ত এক দশক আগের স্মৃতি রোমন্থন করেন। ২০১৩ সালেও তিনি তখনকার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একই ধরনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এক দশক পর আবারও সেই একই প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। শেখর গুপ্তের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন থাকলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি তুলনামূলকভাবে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এখানে কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নেয়নি, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
ভারত ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ল্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্ট (এলবিএ) বা সীমান্ত চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মোদি সরকার ২০১৫ সালে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করে একটি বড় কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছিল। এর ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যা মিটে গেছে। নেপালের মতো বন্ধুপ্রতীম দেশ যখন ভারতের সাথে নতুন সীমান্ত বিরোধ তৈরি করছিল, তখন বাংলাদেশের সাথে এই অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান ছিল মোদির বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতির উদাহরণ।
শেখর গুপ্তের মতে, এখন সময় এসেছে শেখ হাসিনা আমলের সেই ‘একপাক্ষিক ঘনিষ্ঠতা’র মোহ কাটিয়ে বাস্তবসম্মত ভারসাম্য রক্ষার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৮ মাসে বৈদেশিক নীতিতে কিছুটা ভিন্ন ধারা বজায় রেখেছে, যা নয়াদিল্লির জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর ছিল। তবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষমতা যখন একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে যাবে, তখন ভারতের উচিত হবে পুরনো তিক্ততা ঝেড়ে ফেলে নতুন নেতৃত্বের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা।
ভারতীয় এই সাংবাদিক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ এবং তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ভারতের বাস্তবমুখী বুদ্ধির পরিচয় দেয়। জনমত জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি জনসমর্থনে অনেক এগিয়ে। ‘প্রথম আলো’র জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের প্রধান ইস্যু এখন কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি, কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি বা ভারত-বিদ্বেষ নয়।
শেখর গুপ্তের বার্তা স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ভোট ব্যাংক সামলাতে গিয়ে যদি বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত থাকে, তবে ভারত তার পূর্ব প্রান্তে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ডেকে আনবে। তার প্রশ্নটি ছিল সরাসরি—ভারত কি তার পূর্ব সীমান্তে একটি ‘বাংলাভাষী পাকিস্তান’ দেখতে চায়, নাকি স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশী? আসন্ন নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ভারতের এই কৌশলগত দূরদর্শিতা।

