২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে সাভারের আশুলিয়ায় যে ভয়াবহতার সাক্ষী হয়েছিল পুরো দেশ, দেড় বছর পর তার বিচারিক চূড়ান্ত ফয়সালা হলো। আশুলিয়ায় সাতজনকে হত্যা এবং ছয়জনের মরদেহ ভ্যানে স্তূপ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার লোমহর্ষক ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং একজন খালাস পেয়েছেন।
এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের বিচারিক সমাপ্তি
গত জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাভার-আশুলিয়া এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানোর আগ মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হাতে প্রাণ হারান অসংখ্য মানুষ। তবে আশুলিয়া থানার সামনে ভ্যানে লাশের স্তূপ সাজিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, এই অপরাধ কেবল হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক চরম অবমাননা। নিরস্ত্র মানুষের ওপর এই পৈশাচিক আচরণ সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত নিহতের স্বজনদের চোখে ছিল অশ্রু, তবে তা শোকের চেয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার স্বস্তিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকা
ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাদের সর্বোচ্চ দণ্ড বা ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ রনি, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া, আশুলিয়া থানার তৎকালীন এসআই আব্দুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা এবং কনস্টেবল মুকুল চোকদার।
আদালত মনে করেন, জনগণের জানমালের রক্ষক হয়েও পুলিশের এই সদস্যরা যেভাবে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছেন এবং পরবর্তীতে লাশ পোড়ানোর মতো অমানবিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন, তা ক্ষমার অযোগ্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালী হিসেবে সাবেক এমপি সাইফুল ও স্থানীয় নেতা রনি ভূঁইয়ার প্রত্যক্ষ উসকানি ও নির্দেশনার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে।
যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা
মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও মামলার অন্য ৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন এবং সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস।
এছাড়া এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, এই মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ায় সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে আদালত খালাস দিয়েছেন। বিচারকের মতে, সত্য উদঘাটনে আবজালুল হকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আদালতের কার্যক্রম ও পরিবেশ
বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে কারাগারে থাকা আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। আদালত কক্ষের বাইরে এবং হাইকোর্ট এলাকা জুড়ে তখন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সকাল থেকেই আদালতের বাইরে ভিড় করতে থাকেন। তাদের হাতে ছিল প্রিয়জনদের ছবি।
বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করেন। তিনি জানান, প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাখিল করা ৩১৩ পৃষ্ঠার অভিযোগনামা এবং ১৬৮ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দুটি পেনড্রাইভে থাকা ভিডিও ফুটেজ ও ডিজিটাল এভিডেন্স অপরাধীদের শনাক্ত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
যে সাত শহীদের রক্তে লেখা এই রায়
আশুলিয়ার সেই দিনের ঘটনায় নিহত সাতজন হলেন— সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়োজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম। তাদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই রায় এলো।
নিহত সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ছেলেকে যারা মেরেছে, তাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। এখন শুধু চাই এই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। তাহলেই আমার ছেলের আত্মা শান্তি পাবে।”
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া
এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত বছরের ২১ আগস্ট। সে সময় গ্রেপ্তার থাকা আট আসামির সাতজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। তবে এসআই শেখ আবজালুল হক আদালতে দাঁড়িয়ে দোষ স্বীকার করে সেই দিনের পৈশাচিকতার বর্ণনা দেন।
আশুলিয়ার সেই লাশ পোড়ানোর ভিডিও চিত্র যখন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের গাড়িতে সিভিল পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের দ্বারা লাশের ওপর পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য ছিল আধুনিক বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। প্রসিকিউশন পক্ষ শুরু থেকেই দাবি করে আসছিল যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং আন্দোলন দমানোর জন্য একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা ছিল।
সমাপ্তি ও প্রত্যাশা
এই রায়ের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচারের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হলো। যদিও অনেক আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন, তবে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি— দণ্ডপ্রাপ্তদের ফিরিয়ে এনে দ্রুত সাজা কার্যকর করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় মানবাধিকার রক্ষায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রুখতে এক শক্তিশালী বার্তা দেবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এটি কেবল সাভারের সাতটি পরিবারের ন্যায়বিচার নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের হাজারো শহীদের রক্তের ঋণ শোধের পথে একটি বড় ধাপ।

