চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবার চূড়ান্ত সংঘাতের পথে হেঁটেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। টানা চার দিনের বিক্ষোভ ও খণ্ডকালীন কর্মবিরতির পর এবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’।
মঙ্গলবার দুপুরে বন্দর এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশ থেকে এই ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বন্দরের কোনো চাকা ঘুরবে না। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করে সরকার উল্টো দমন-পীড়ন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছে। ইব্রাহিম খোকন বলেন, “নৌ-উপদেষ্টা আমাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতাকে পাশ কাটিয়ে বারবার হুমকি দিচ্ছেন। আমাদের সক্রিয় সদস্যদের পটুয়াখালীর পায়রা ও মোংলা বন্দরে শাস্তিমূলক বদলি করা হচ্ছে। এমনকি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল-জরিমানার ভয়ও দেখানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ায় আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি।”
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিকরা। এতে করে দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে পণ্য নামানো যেমন বন্ধ ছিল, তেমনি রপ্তানিযোগ্য কনটেইনার জাহাজে তোলার কাজও ছিল বন্ধ। জেটি থেকে কাস্টমস গেট পর্যন্ত শ্রমিকদের মিছিলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বন্দর এলাকা।
শ্রমিকদের প্রধান তিনটি দাবির মধ্যে রয়েছে—এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনার ভার দুবাইভিত্তিক অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে তুলে না দেওয়া, বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যানের পদত্যাগ এবং আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে জারি করা সব বদলির আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার। তাদের দাবি, লাভজনক এই টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিলে বন্দরের নিজস্ব আয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের স্বার্থবিরোধী হবে।
এই টানা অচলাবস্থায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকরা। চার দিন ধরে জেটিতে জাহাজ অপেক্ষমাণ থাকায় বিশাল আর্থিক দণ্ড গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি সেলিমুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বন্দরের এই স্থবিরতার কারণে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে আমরা বিশ্ববাজার থেকে ছিটকে পড়ব। এছাড়া কাঁচামাল সময়মতো খালাস না হওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।”
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল জানান, বর্তমানে এনসিটি ছাড়াও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থসহ গুরুত্বপূর্ণ সব টার্মিনালের কার্যক্রম বন্ধ। বন্দর ভবন অভিমুখে আজ শ্রমিকদের একটি কালো পতাকা মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বদলির বিষয়টিকে ‘নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ বলা হলেও শ্রমিকরা তা মানতে নারাজ। এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত বরফ গলবে, নাকি এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও সংকটে ফেলবে—সেদিকেই এখন সবার নজর।

