জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের বদলে সেবাগ্রহীতার কাছে মোটা অংকের ঘুষ দাবি ও দুর্নীতির অভিযোগে ফরিদপুরের অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমানকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তাকে ‘চাকরি হইতে বরখাস্ত’ (Dismissal from Service) নামক গুরুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এই বরখাস্তের আদেশ ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় মাহফুজুর রহমান যখন গোপালগঞ্জের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এক ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্ম তারিখ ১০ বছর কমানোর জন্য আবেদন করলে মাহফুজুর রহমান সেই ফাইলটি নিষ্পত্তির জন্য এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ দর-কষাকষির পর সেই টাকার অংক ১ লাখ ৭০ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
তবে সেবাগ্রহীতা সেই ঘুষের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে ক্ষিপ্ত হয়ে মাহফুজুর রহমান আবেদনটি বাতিল করে দেন। রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এই অপেশাদার আচরণ ও প্রকাশ্য দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই আবেদনকারী ঘুষ দাবির কথোপকথনের অডিও রেকর্ডসহ নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নির্বাচন কমিশন থেকে একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর মাহফুজুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (নম্বর-১২/২০২৫) দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত চলাকালীন ঘুষ দাবির অডিও রেকর্ডটি পরীক্ষার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হয়। সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, অডিও রেকর্ডের কণ্ঠস্বরটি মাহফুজুর রহমানেরই ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ সুনিপুণভাবে উঠে আসায় তাকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ নেওয়া হলে তারাও এই কঠোর শাস্তির পক্ষে মত দেয়। সর্বশেষ মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত ১ ফেব্রুয়ারি দণ্ড প্রদানের প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন।
বর্তমানে ফরিদপুরে অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বদলি থাকলেও আগে থেকেই সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় ছিলেন তিনি। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের হয়রানি রোধে এবং নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই পদক্ষেপ একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এনআইডি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই বরখাস্তের ঘটনাটি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

