বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে এক যৌথ অভিযানে চারজন নারী যাত্রীর কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক মোবাইল হ্যান্ডসেট উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের নতুন কৌশল এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারির গুরুত্বকে পুনরায় সামনে এনেছে।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের একটি ফ্লাইটে ওই চার যাত্রী ঢাকায় অবতরণ করেন। এই অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোনগুলোর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দরের কাস্টমস এবং এভসেকের (বিমান বাহিনী) সদস্যরা এই চোরাচালান রুটের ওপর বিশেষ নজরদারি চালাচ্ছিলেন। তারা যৌথভাবে ওই ফ্লাইটের অভ্যন্তরের সব যাত্রীর গতিবিধি বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখেন।
বিমানবন্দর ও বেবিচক (বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ) সূত্র নিশ্চিত করেছে, গ্রিন চ্যানেল অতিক্রম করার সময় তল্লাশি চালিয়ে ওই চারজন মহিলা যাত্রীর শরীর ও বিশেষ কায়দায় লুকানো স্থান থেকে এই বিপুল সংখ্যক মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত চার নারী যাত্রীরা হলেন: সামিয়া সুলতানা, শামিমা আক্তার, জয়নব বেগম এবং নুসরাত।
তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া হ্যান্ডসেটগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ: আইফোন ১৭ প্রো-ম্যাক্স: ৩৫টি, আইফোন ১৫: ৫৫টি, গুগল পিক্সেল ফোন: ১২টি, মোট হ্যান্ডসেট: ১০২টি।
যাত্রীরা এই বিপুল পরিমাণ মোবাইল ফোন সম্পর্কে কোনো বৈধ কাগজপত্র বা তথ্য দেখাতে ব্যর্থ হলে বিমানবন্দর কাস্টমস ৯৮টি মোবাইল ফোন জব্দ করে। এই ফোনগুলো অবৈধ চোরাচালানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মাদ কাউছার মাহমুদ এই ঘটনা নিশ্চিত করেছেন এবং চোরাচালানিদের নতুন কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিনিয়ত চোরাকারবারিরা বিভিন্ন সময় স্বর্ণ, মোবাইল, সিগারেটসহ মূল্যবান সামগ্রী পাচার করে থাকে। বিশেষ করে দুবাই বা শারজাহ থেকে ঢাকায় আগমন করা বিমানগুলোতে এই ধরনের পাচার বেশি হয়।
মুহাম্মাদ কাউছার বলেন, সময়ের সাথে সাথে চোরাকারবারিরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। এখন তারা দুবাই বা শারজাহ থেকে যে সব বিমান চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকায় আসে, সেই ট্রানজিট রুট ব্যবহার করছে।
১. হস্তান্তর: দুবাই বা শারজাহ থেকে আসা ফ্লাইটে চোরাচালানের পণ্যগুলো চট্টগ্রামে নামানো হয় না। ২. যোগাযোগ: চট্টগ্রামে ট্রানজিট নেওয়ার সময় চোরাকারবারিদের নিজস্ব কিছু লোক ঢাকা আসার জন্য ফ্লাইটে ওঠে। ৩. স্থানান্তর: এই অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ওঠা ব্যক্তিরাই বিমানের মধ্যে অত্যন্ত কৌশলে দুবাই থেকে আসা যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণ বা মোবাইল হ্যান্ডসেটগুলো সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এই ঘটনায় প্রমাণ হলো যে, চোরাচালান সিন্ডিকেট এখন আন্তর্জাতিক রুটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রুটের ট্রানজিট প্রক্রিয়া ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার এবং নিরাপত্তা চোখকে এড়িয়ে যাওয়ার নতুন পথ খুঁজে নিয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক মোবাইল ফোন উদ্ধারের ঘটনা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের দক্ষতা ও বিশেষ নজরদারির ফল। তবে এটি দেশের অর্থনীতি এবং সরকারের রাজস্বের ওপর চোরাচালানের যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, সেদিকেও ইঙ্গিত করে। অবৈধ পথে আসা এসব ইলেকট্রনিক্স পণ্য দেশের বৈধ বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সরকারকে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে।
এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত নারী যাত্রীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এখন এই চারজনের সঙ্গে জড়িত মূল চোরাচালান সিন্ডিকেট এবং এই নতুন ট্রানজিট রুট ব্যবহার করে পরিচালিত নেটওয়ার্কের সন্ধানে জোর তদন্ত শুরু করেছে। চোরাচালান রোধে বিমানবন্দর নিরাপত্তা এবং কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মধ্যে আরও সমন্বয় এবং ট্রানজিট রুটের ওপর কঠোর নজরদারি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

