রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে—প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবাই পরাজয়ের প্রথম ধাপ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান সম্প্রতি বগুড়ায় বলেছেন, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জয়ের আশা করা বৃথা। তার এই উপলব্ধি অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, বিএনপির সামনে এবার কঠিন এক পরীক্ষা।
দীর্ঘ ১৮ বছরের লড়াই-সংগ্রাম শেষে বিএনপি যখন ক্ষমতার দোরগোড়ায়, তখন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একসময়ের মিত্র দল জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ দৃশ্যপট থেকে সরে যাওয়ার পর জামায়াত এখন দেশজুড়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তির মহড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ‘বট’ বাহিনীর প্রচারণা এবং সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক কর্মকাণ্ড বিএনপিকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জামায়াতের বহুমুখী কৌশল ও বিএনপির সীমাবদ্ধতা
নির্বাচন মানেই ক্ষমতার লড়াই, যেখানে আদর্শের চেয়ে কৌশল অনেক সময় বড় হয়ে দাঁড়ায়। জামায়াত এবার সেই কৌশলে অনেকটাই আগ্রাসী। তারা কেবল ধর্মীয় আবেদন নয়, বরং হিন্দু ভোটারদের টানতে ‘হিন্দু শাখা’ খোলা বা গীতাপাঠের মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এছাড়া গৃহিণীদের মন জয়ে ঘরে ঘরে উপহার পাঠানো এবং নিম্নবিত্ত ভোটারদের আর্থিক সহায়তার যে নীরব তৎপরতা তারা শুরু করেছে, তার বিপরীতে বিএনপির প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জামায়াত যখন রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বস্তিগুলোতে অর্থ ও জনবল ঢালছে, তখন বিএনপি কি কেবল তাদের বিপুল ‘জনপ্রিয়তার’ ওপর ভরসা করে বসে থাকবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা বিএনপিকে ভালোবাসলেও বুথ পর্যন্ত তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য যে সাংগঠনিক ও আর্থিক রসদ প্রয়োজন, তাতে জামায়াত বর্তমানে অনেক এগিয়ে।
তারেক রহমানের পাশে সিনিয়রদের অনুপস্থিতি: জনমনে প্রশ্ন
তারেক রহমান দেশে ফেরার পর তার প্রতিটি জনসভায় লাখো মানুষের ঢল নামছে। তার প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘কৃষক কার্ড’-এর পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। কিন্তু একটি বিষয় জনমনে খটকা তৈরি করছে—মঞ্চে তারেক রহমানের দুই পাশের চেয়ারে দলের ‘বটবৃক্ষ’ তথা সিনিয়র নেতাদের অভাব।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বা বেগম খালেদা জিয়ার সময় দলের নীতি-নির্ধারণী স্তম্ভরা সবসময় নেতার পাশে থাকতেন, যা নেতৃত্বের গভীরতা ও দলের ঐক্যকে ফুটিয়ে তুলত। বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বা রুহুল কবির রিজভীর মতো জনপ্রিয় নেতাদের তারেক রহমানের নির্বাচনী মঞ্চে পর্যাপ্ত পরিমাণে দেখা না যাওয়ায় তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অস্পষ্টতা তৈরি হচ্ছে।
ভেতরের শত্রু ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাঁটা
বিএনপির জন্য এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় কাঁটা হলো ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’। জোটের শরিকদের আসন ছেড়ে দেওয়ার পর দেশের অন্তত ৭৯টি আসনে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে রয়ে গেছেন। এর ফলে ভোট ভাগাভাগির সুযোগ নিয়ে জামায়াত বা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে। এছাড়া দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা ‘ছদ্মবেশী’ প্রতিপক্ষের বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
দিস টাইম অর নেভার: এবারই সময়
কাকতালীয়ভাবে জামায়াত ও বিএনপির এই লড়াইকে অনেকে ঈশপের গল্পের কচ্ছপ ও খরগোশের দৌড়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা বিএনপি যদি খরগোশের মতো আত্মতৃপ্তিতে ভোগে, তবে সুসংগঠিত জামায়াত কচ্ছপের মতো ধীরস্থির কৌশলে বাজিমাৎ করে দিতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, এটি বিএনপির অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই। বিশেষ করে ঢাকা-১৭ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যেখানে তারেক রহমান নিজে প্রার্থী, সেখানে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভোট নিশ্চিত করতে বিএনপিকে আরও বাস্তবমুখী হতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ আগাম মন্ত্রিসভার তালিকা করে ফেলেছিল, কিন্তু জয়ী হয়েছিল বিএনপি। ইতিহাসের সেই শিক্ষা বর্তমান বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। দশে মিলে কাজ করার সেই চিরন্তন নীতিই হতে পারে বিএনপির জয়ের মূল চাবিকাঠি।

