দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে হস্তান্তরের পথ এখন পুরোপুরি নিষ্কণ্টক। টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলছিল, তার অবসান ঘটেছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই চুক্তি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে জারি করা রুল খারিজ করে রায় দিয়েছেন।
এই রায়ের ফলে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি কোনো দক্ষ অপারেটরের হাতে ছেড়ে দিতে আর কোনো আইনি জটিলতা থাকল না। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর এই ইস্যুতেই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে দ্বিধাবিভক্ত রায় এসেছিল। সে সময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু কনিষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিটটি খারিজ করে চুক্তির পক্ষে মত দেন। নিয়মানুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি তখন বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ সেই একক বেঞ্চ তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ৩০ জুলাই, যখন বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন একটি জনস্বার্থমূলক রিট দায়ের করেন। রিটে দাবি করা হয়েছিল, এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব কোনো অপারেটরকে দেওয়ার আগে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং (দরপত্র) নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশিদের হাতে এই সম্পদ তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনও রিটে সংযুক্ত করা হয়েছিল।
রিটকারী পক্ষের মূল যুক্তি ছিল, আইন ও নীতি অনুসরণ না করে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশিদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতেই এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজকের রায়ে আদালত বন্দর কর্তৃপক্ষের এই যুক্তিকেই বৈধতা দিল।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য দুবাই ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এই টার্মিনাল পরিচালিত হলে বন্দরের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়বে।
জাতীয় অর্থনীতির এই হৃদপিণ্ডের পরিচালনার ভার বিদেশিদের হাতে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, আইনি লড়াইয়ে আপাতত সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষই জয়ী হলো।

