দেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা মেটানো এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বার্ষিক ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে উচ্চমানের মার্কিন গমের একটি বড় চালান খালাস কার্যক্রম পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের আনুষ্ঠানিকতা ত্বরান্বিত হলো।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এদিন চট্টগ্রাম বন্দর সফর করেন। তার এই সফর কেবল একটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিদর্শন নয়, বরং ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংহতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বন্দরে তাকে স্বাগত জানান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার।
সকাল থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়। প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন উচ্চমানের মার্কিন গম নিয়ে আসা একটি জাহাজ খালাসের অপেক্ষায় ছিল। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন এই আগমন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই সহযোগিতা দুই দেশের কৃষিখাত ও অর্থনীতির জন্য একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে তার মোট গমের চাহিদার মাত্র ১৩ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন করতে সক্ষম। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমদানির ওপর এই নির্ভরশীলতা গত কয়েক বছরে আরও বেড়েছে। ফলে বিশ্বস্ত সরবরাহকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তিকে অত্যন্ত কৌশলগত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ অনুমোদিত ‘ইউ.এস. হুইট অ্যাসোসিয়েটস’ (ইউএসডব্লিউএ)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির নিশ্চয়তা পেয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীল বাজারে যা বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর।
আমদানিকৃত এই শস্যের তালিকায় রয়েছে বৈচিত্র্য। ওয়াশিংটন, ওরেগন এবং আইডাহো অঙ্গরাজ্য থেকে আনা হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন ‘সফট হোয়াইট’ জাতের গম। অন্যদিকে, মনটানা ও নেব্রাস্কা থেকে আসছে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন ‘হার্ড রেড উইন্টার’ জাতের গম। এই ভিন্ন ভিন্ন জাতের গম বাংলাদেশের বেকারি ও আটা শিল্পে গুণগত মান নিশ্চিত করবে।
আন্তর্জাতিক পণ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাগ্রোকর্প’-এর মাধ্যমে ইতিমধ্যে তিনটি বৃহৎ বিক্রয় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় মোট ৬ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন গম ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি গম ইতিমধ্যে বাংলাদেশের গুদামে পৌঁছেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এ ধরনের বড় কার্গো দ্রুত খালাস করা সম্ভব হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্যবাহী জাহাজগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বার্থিং সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার খালাস প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার এই উদ্যোগকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য মজুত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, সরকারি গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে বিশ্ববাজারের মানসম্পন্ন শস্যের দিকেই বাংলাদেশের নজর। মার্কিন গমের মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, যা দেশের সাধারণ মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে।
রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, মার্কিন কৃষকরা বাংলাদেশের এই ক্রমবর্ধমান বাজারের অংশ হতে পেরে গর্বিত। এটি কেবল পণ্য কেনাবেচা নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও আস্থার প্রতিফলন। ভবিষ্যতে কৃষি প্রযুক্তিতেও সহযোগিতার ইঙ্গিত দেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে বিশ্বব্যাপী গমের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বাঁচতে বিকল্প উৎসের সন্ধান করছিল বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই চুক্তি সেই সংকটের একটি টেকসই সমাধান হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশের আটা ও ময়দার বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতেও বড় ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে যখন ক্রেনগুলো বিশাল বিশাল বাকেট দিয়ে জাহাজ থেকে গম নামাচ্ছিল, তখন উপস্থিত কর্মকর্তাদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। বাংলাদেশের মানুষের ডিনারের টেবিলে পাউরুটি বা রুটি নিশ্চিত করতে হাজার মাইল দূর থেকে আসা এই সোনালি দানাগুলো এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাইলোতে পৌঁছানোর অপেক্ষায়।
বাণিজ্যিক এই লেনদেনের বাইরেও সফরের একটি কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েই চলেছে। এমন সময় খাদ্য ও কৃষির মতো মৌলিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একে কেবল আমদানি-রপ্তানি হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদী এই চুক্তিটি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের জন্যও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে স্থানীয় ময়দা কলগুলো তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে পারবে সহজে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে হুটহাট করে সরবরাহ ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা কমে যাবে অনেকটাই।
সবশেষে, চট্টগ্রাম বন্দরের এই ব্যস্ততা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ তার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বিশ্ববাজারের সাথে সুদৃঢ় সংযোগ বজায় রাখছে। মার্কিন গমের এই চালান কেবল বন্দরে নোঙর করা একটি জাহাজ নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা কোনো দুশ্চিন্তার কারণ হবে না।

