চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে রাজধানীর চানখারপুলে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সোমবার দুপুরে ঘোষিত এই রায়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনায় এই কঠোর দণ্ড দিলেন আদালত।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় পড়েন। মামলার গুরুত্ব ও অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে আদালত সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকেও একই সাজা অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় ছয়জন বিক্ষোভকারীকে হত্যার পেছনে ডিএমপির তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে অধস্তন পুলিশ সদস্যদের মারণাস্ত্র ব্যবহারের যে নির্দেশ হাবিবুর রহমান দিয়েছিলেন, তা প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আদালত এই কর্মকাণ্ডকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির বাইরেও আরও পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর এবং শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের জেল দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কনস্টেবল পদমর্যাদার তিন সদস্য—মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইশমামুল হক ও মানিক মিয়া নামের ছয়জন ব্যক্তি প্রাণ হারান। তারা সবাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। প্রসিকিউশন তাদের দাবির সপক্ষে ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং ১৯টি ভিডিও ফুটেজসহ বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ও প্রিন্ট প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করে।
এই মামলার মোট আটজন আসামির মধ্যে মাত্র চারজন বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। সাজাপ্রাপ্ত আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুলকে আজ সকালে কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তবে রায়ের মূল তিন হোতা হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও আখতারুল ইসলামসহ ইমরুল এখনো পলাতক রয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং তাদের গ্রেফতারে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে।
বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী সমন্বিত এই প্যানেল তাদের রায়ে বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ কোনোভাবেই পেশাদারিত্বের আওতায় পড়ে না। এটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য চালানো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ১৯টি ভিডিও এবং পত্রিকার ১১টি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, সেদিন চানখারপুলে পুলিশি আক্রমণ ছিল অত্যন্ত নৃশংস।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ ডিসেম্বর রায়ের এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। মাঝে ২০ জানুয়ারি রায় ঘোষণার কথা থাকলেও কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির কারণে তারিখ পিছিয়ে আজ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথমদিকের মামলা হলেও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এটি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত নিহতদের স্বজনরা এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ তারা ন্যায়বিচার পেলেন। তবে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিশেষ করে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তার এমন সাজা ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক করবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
প্রসিকিউশন টিম জানিয়েছে, জব্দ তালিকায় থাকা ছয়টি মৃত্যুসনদ এবং অডিও রেকর্ডিংগুলো এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ওয়্যারলেসে দেওয়া নির্দেশের সেই অডিও ক্লিপগুলোতে স্পষ্ট ছিল যে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ‘শ্যুট টু কিল’ বা দেখামাত্র গুলির অলিখিত নির্দেশ ছিল। এই রায় বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি বিশেষ নজির হয়ে থাকবে, যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তাদের অধস্তনদের অপকর্মের দায়ভার বহন করতে হলো।
বিকেলের দিকে দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় আদালত প্রাঙ্গণে থাকা সাধারণ মানুষ স্লোগান দিয়ে এই রায়কে স্বাগত জানান। জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার পথে এই রায়কে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা। এখন সবার নজর পলাতক আসামিদের দিকে, যাদের খুঁজে বের করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

