রাজধানীর নয়াপল্টনে একটি স্কুলে চার বছরের কম বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ঘটনায় অবশেষে আইনের জালে ধরা পড়েছেন অভিযুক্ত ব্যবস্থাপক। শুক্রবার ভোরে মিরপুরের একটি গোপন আস্তানা থেকে পবিত্র কুমার বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পল্টন থানা পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টনের ‘শারমিন একাডেমি’ নামের একটি বেসরকারি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ভুক্তভোগী শিশুটি সেখানে প্রি-প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী। তবে ঘটনাটি জনসম্মুখে আসে গত বুধবার, যখন শিশুটিকে মারধরের একটি শিউরে ওঠা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
গ্রেপ্তারকৃত পবিত্র কুমার বড়ুয়া ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহানের স্বামী। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তিনি ও তার স্ত্রী আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, প্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে আজ ভোরে মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের একাধিক দল এই অমানবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ধরতে কাজ করছিল। পবিত্রকে বর্তমানে পল্টন থানায় রাখা হয়েছে এবং তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে মামলার প্রধান আসামি এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এখনো পলাতক রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে ধরার জন্য সম্ভাব্য সব জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ডিবি ও থানা পুলিশ।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, অত্যন্ত কোমলমতি ওই শিশুটিকে তুচ্ছ কারণে নির্দয়ভাবে প্রহার করা হচ্ছে। শিশুটির কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও মন গলেনি নির্যাতনকারীর। ভিডিওটি দেখে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। অভিভাবকরা ওই স্কুলের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভও প্রদর্শন করেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার শিশুটির মা বাদী হয়ে পল্টন থানায় ‘শিশু অধিকার আইন’ অনুযায়ী একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় পবিত্র কুমার বড়ুয়া ও শারমিন জাহানকে সরাসরি আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অন্যতম প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলো পুলিশ।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান জানান, মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। প্রাথমিক তদন্তে স্কুলে সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রমাণ মিলেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নয়াপল্টন মসজিদ রোডে অবস্থিত শারমিন একাডেমি ভবনটিতে তালা ঝুলছে। কর্তৃপক্ষের সবাই গা ঢাকা দেওয়ায় স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের কথা শোনা গিয়েছিল।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, চার বছরের কম বয়সী একটি শিশুর ওপর এমন শারীরিক ও মানসিক আঘাত তার দীর্ঘমেয়াদী বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বয়সের শিশুরা বিদ্যালয়ে যায় আনন্দময় পরিবেশের খোঁজে, কিন্তু সেখানে এমন সহিংসতা তাকে ট্রমার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক নেটিজেন দাবি তুলেছেন, শুধু গ্রেপ্তার নয়, এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে শিক্ষার নামে এমন পৈশাচিকতার শিকার হতে না হয়।
গ্রেপ্তারকৃত পবিত্র বড়ুয়াকে আজই আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করা হতে পারে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনার নেপথ্যে আর কোনো কারণ আছে কি না বা অন্য কেউ এই নির্যাতনে ইন্ধন জুগিয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি স্কুলে নিরাপত্তার এমন চরম অভাব এবং কর্তৃপক্ষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ক্ষুব্ধ অভিভাবক সমাজ। অনেক অভিভাবক এখন তাদের সন্তানদের ওই স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত এই আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

