আইনি লড়াইয়ের শেষ ধাপে এসে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেন কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। ঋণখেলাপির তথ্য গোপনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এর ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ আপাতত রুদ্ধ হয়ে গেল এই প্রভাবশালী নেতার।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতের এই রায়ের ফলে এলাকায় তার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিষণ্ণতা নেমে এলেও নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৭ জানুয়ারি, যখন নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানির পর মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর আগে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তবে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন একই আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ ছিল, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী তার হলফনামায় বড় অঙ্কের একটি ঋণের তথ্য গোপন করেছেন এবং তিনি একজন ঋণখেলাপি। নির্বাচন ভবন মিলনায়তনে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে ইসি হাসনাতের আপিল মঞ্জুর করে এবং মুন্সীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। বুধবার আদালতে তার পক্ষে আইনি লড়াই চালান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। অন্যদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন লিপু।
শুনানি শেষে আদালত রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। হাসনাতের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু সাংবাদিকদের বলেন, “আদালতের কাছে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করে প্রতারণা করেছিলেন বলে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি। আদালত ইসির সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। ফলে তিনি আর প্রার্থী হতে পারছেন না।” তবে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী হিসেবে তিনি এই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী দেবীদ্বার আসনে বিএনপির এক শক্তিশালী মুখ। ২০০৮ সাল পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মামলা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এলাকায় নিজের প্রভাব ধরে রেখেছিলেন। তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির কোনো বিকল্প প্রার্থী থাকবে কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে জল্পনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে, এই রায়ের ফলে হাসনাত আবদুল্লাহর অবস্থান অনেকটা শক্ত হলো বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। হাসনাত আবদুল্লাহ কেবল অভিযোগকারী নন, তিনি ওই এলাকায় তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। মুন্সীর মতো একজন বর্ষীয়ান নেতার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়া তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
হাইকোর্টের আদেশের খবর কুমিল্লায় পৌঁছানোর পর দেবীদ্বার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সমর্থকরা এই রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করলেও বিপক্ষ শিবিরের কর্মীরা একে আইনের জয় হিসেবে দেখছেন। সাধারণ ভোটারদের মতে, প্রভাবশালী প্রার্থীদের তথ্য গোপনের এই প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
এখন সবার নজর মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তিনি কি শেষ মুহূর্তের চেষ্টা হিসেবে আপিল বিভাগে যাবেন, নাকি তার দল এই আসনে নতুন কোনো কৌশলে এগোবে—তা আগামী কয়েক দিনেই পরিষ্কার হবে।

