রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গণভবন, যা এককালে ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আজ তা ধারণ করছে এক রক্তাক্ত ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে নির্মিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ পরিদর্শন করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি জাদুঘরটির চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন।
পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা কেবল স্থাপনাগুলোই দেখেননি, বরং হারিয়ে যাওয়া এবং নির্যাতিত মানুষের যন্ত্রণার গভীরে ডুব দিয়েছেন। তিনি সেখানে ১৫ মিনিটের একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র দেখেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্মিত এই তথ্যচিত্রে গত ১৬ বছরের শাসনকাল, গুমের সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং সবশেষে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার পর অধ্যাপক ইউনূস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এটি সারা বিশ্বের জন্য এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।” তিনি উল্লেখ করেন, পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম দেশই এত দ্রুত বিপ্লবের স্মৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছে। এটি মূলত আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সতর্কবার্তা এবং দিশারি হিসেবে কাজ করবে।
প্রধান উপদেষ্টা যখন জাদুঘরের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন, তার চোখেমুখে ছিল গভীর শোক ও সংকল্পের ছাপ। জাদুঘরটিতে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অজস্র ছবি, শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, আবেগঘন চিঠিপত্র এবং সে সময়কার গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমনকি জনরোষের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সেখানে সংরক্ষিত।
জাদুঘরের এক কোণে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে কুখ্যাত ‘আয়নাঘর’। সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠের সামনে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “দেশের প্রতিটি নাগরিকের এখানে এসে অন্তত একটি দিন কাটানো উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের দল বেঁধে আসা প্রয়োজন।” তিনি প্রস্তাব করেন, যদি কেউ চায় তবে এই আয়নাঘরের আদলে তৈরি কক্ষে কয়েক ঘণ্টা বা পুরো একটি দিন কাটাতে পারে, যাতে সে উপলব্ধি করতে পারে কী অমানবিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বন্দিরা দিন পার করেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি আমাদের জাতি কখনো কোনো কারণে দিশাহারা হয়ে পড়ে, তবে এই জাদুঘরেই তারা সঠিক পথ খুঁজে পাবে।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, এই জাদুঘর কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি জাতীয় আত্মোপলব্ধির জায়গা। আমরা যেন আর কখনো সেই নৃশংস অন্ধকার সময়ে ফিরে না যাই, এটিই হোক বর্তমানের অঙ্গীকার।
প্রধান উপদেষ্টার এই পরিদর্শনে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের এক বিরল দৃশ্য দেখা গেছে। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চেতনা দলমতের ঊর্ধ্বে।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। এ ছাড়াও স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টারাও এই ইতিহাসের সাক্ষী হতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। সবার চোখেমুখে ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন গুমের শিকার পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলি এবং গুম থেকে ফিরে আসা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেন। বছরের পর বছর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো সেই ভিকটিমদের উপস্থিতি জাদুঘরটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আব্দুল্লাহও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর তানজীম ওয়াহাব ও স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম খান অতিথিদের পুরো এলাকাটি ঘুরিয়ে দেখান। ফারুকী জানান, অত্যন্ত স্বল্প সময়ে এই জাদুঘরটির কাজ এই পর্যায়ে আনা একটি রেকর্ড। তিনি বলেন, “এটি সম্ভব হয়েছে অনেক তরুণ-তরুণীর অক্লান্ত পরিশ্রমে। গত আট মাস ধরে অনেকে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এখানে কাজ করেছেন।”
জাদুঘরটিতে সে সময়কার সংবাদপত্রের কাটিং এবং অডিও-ভিডিও ক্লিপিংগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা একজন দর্শনার্থীকে সরাসরি জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো শহীদদের রক্তমাখা জামাগুলো যেন চিৎকার করে বলছে এক স্বাধীন ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের দাবি।
প্রধান উপদেষ্টা পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই নৃশংসতা যেন আর কখনোই ফিরে না আসে, সেজন্য আমাদের সবাইকে এক থাকতে হবে। একনায়কতন্ত্রের যে বীভৎস রূপ এই ভবনটি দেখেছে, সেখান থেকেই যেন গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় হয়।
এই জাদুঘরটি কেবল ঢাকা বা বাংলাদেশের নয়, এটি সারা বিশ্বের স্বৈরশাসনবিরোধী লড়াইয়ের এক চিরস্থায়ী স্মারক হয়ে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে যে, জনগণের শক্তির কাছে শেষ পর্যন্ত যেকোনো ফ্যাসিবাদকে নতি স্বীকার করতে হয়।
এই প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের প্রতি তাদের সম্মান প্রদর্শন করল। এখন এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়, যারা এখানে এসে তাদের হারানো ভাই-বোনদের বীরত্বের গল্প শুনবে এবং শপথ নেবে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার।

