চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে এবার কঠোর সামরিক কায়দায় অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। বাহিনীটির মহাপরিচালক (ডিজি) একেএম শহিদুর রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের গড়ে তোলা অবৈধ আস্তানাগুলো খুব শীঘ্রই গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে এবং সন্ত্রাসীদের সমূলে নির্মূল করা হবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় র্যাব-৭ এর সদর দপ্তরে এক আবেগঘন পরিবেশে এই হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এর আগে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় নিহত র্যাব কর্মকর্তা নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে র্যাব প্রধান এই বর্বরোচিত হামলার বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন।
র্যাব ডিজি বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। সেখানে যারা অবৈধভাবে পাহাড় দখল করে বাস করছে এবং সাধারণ মানুষের জন্য ত্রাস সৃষ্টি করছে, তাদের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য ধ্বংস করে দেব। এই ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত র্যাব পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।”
ঘটনার প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপের উপস্থিতির খবর পেয়ে অভিযানে যায় র্যাব-৭ এর একটি দল। জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ মুখেই প্রায় ৫০০ জনের একটি সশস্ত্র বাহিনী লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সন্ত্রাসীরা র্যাব সদস্যদের অবরুদ্ধ করে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং পৈশাচিক কায়দায় মারধর শুরু করে।
এই হামলায় বিজিবি থেকে প্রেষণে আসা র্যাবের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মোতালেব হোসেন গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় জিম্মিদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) পাঠালে চিকিৎসক মোতালেব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য এবং একজন তথ্যদাতা বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শহীদ মোতালেব হোসেনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, “আমরা শহীদ মোতালেবের পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। তিনি দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তার এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তার অবর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তানদের পাশে আমরা সবসময় থাকব।”
র্যাব প্রধান আরও উল্লেখ করেন যে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাস জমি নিয়ে গঠিত, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল ভূখণ্ড বর্তমানে ইয়াসিন গ্রুপ ও অন্যান্য দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা নিজস্ব ‘পরিচয়পত্র’ দিয়ে এলাকাটিকে একটি নিষিদ্ধ নগরীতে পরিণত করেছে। অতীতেও সেখানে উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুর ও সংলগ্ন এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুরো এলাকাটি র্যাব ও পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

