ব্যালট পেপারে অনিয়ম এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো উত্তাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। আজ সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবন এলাকা কয়েক হাজার ছাত্রনেতার উপস্থিতিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেলা ১১টার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন ইউনিট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রদলের খণ্ড খণ্ড মিছিল ইসি ভবনের সামনের রাস্তায় জড়ো হতে থাকে। দুপুর গড়াতেই কয়েক হাজার নেতাকর্মী প্রধান ফটকের সামনের সড়কে বসে পড়েন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রেখেছেন।
ইসি ভবনের সামনে সমবেত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট। আমরা এখন শুধু মূল সড়ক অবরোধ করছি, কিন্তু দাবি পূরণ না হলে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হবে নির্বাচন কমিশনের মূল গেট। প্রয়োজনে আমরা সারারাত এখানেই অবস্থান করব।”
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রথমত, পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে ধূলিসাৎ করেছে। দ্বিতীয়ত, একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে কমিশন ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
তৃতীয় এবং অন্যতম প্রধান অভিযোগটি হলো—শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ছাত্র সংসদ বা শাকসু নির্বাচন ঘিরে। ছাত্রদলের অভিযোগ, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষ দলের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে কমিশন এমন কিছু বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য হুমকিস্বরূপ। নেতাকর্মীদের স্লোগানে বারবারই ‘ইসির মেরুদণ্ডহীনতা’র বিষয়টি উঠে আসে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, “তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে ছাত্রদল কর্মীরা এখানে অবস্থান করছে তাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে। যদি কমিশন তাদের আশ্বাসের প্রতিফলন না ঘটায়, তবে ছাত্রদল তাদের দাবি আদায়ে কঠোর থেকে কঠোরতর পন্থা অবলম্বন করতে দ্বিধা করবে না।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জানান, তারা শুধু নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচন কমিশনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই ঘেরাও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন নতুন নতুন মিছিল এসে বিক্ষোভে যোগ দেয়।
এদিকে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এখনো দেওয়া হয়নি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে জলকামানসহ দাঙ্গা দমনের সরঞ্জাম প্রস্তুত রেখেছে। পুরো আগারগাঁও এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গেছে, হাজার হাজার ছাত্রদল কর্মী রাস্তা দখল করে স্লোগান দিচ্ছেন এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও পোস্টাল ব্যালটের স্বচ্ছতা দাবি করছেন। এই আন্দোলনের ঢেউ এখন কেবল নির্বাচন কমিশনের সামনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পড়ছে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ওপরও।
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, “আমরা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব দেখতে চাই। কোনো বিশেষ দলের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করলে ছাত্র সমাজ তা প্রতিহত করবে।” আজকের এই কর্মসূচি থেকে পরবর্তী বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক আসতে পারে বলেও সংগঠনটির উচ্চপর্যায় থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

