জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে এক সময়কার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং সাবেক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মো. মশিউর রহমান রাঙ্গার বিরুদ্ধে এবার দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গণমাধ্যমকে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাঙ্গার পাশাপাশি ঘুষ প্রদানের অভিযোগে কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য পনির উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধেও একই মামলায় মামলা দায়ের করা হবে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাতীয় পার্টির সাবেক এই মহাসচিব এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য কোনো ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও পনির উদ্দিন আহমেদকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সুযোগ করে দিতে বড় অঙ্কের এই লেনদেন করেন। মূলত পদ-পদবি ব্যবহার করে মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমেই এই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, পনির উদ্দিন আহমেদ মেসার্স জলিল বিড়ি ফ্যাক্টরি এবং হক স্পেশাল নামক পরিবহন ব্যবসার মালিক। ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম শাখা থেকে পনির উদ্দিনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে ২০ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয় রাঙ্গার রংপুর শাখার ব্যক্তিগত হিসাবে। এটি ছিল ঘুষের প্রথম কিস্তি।
এরপর একই বছরের নভেম্বর মাসে সোনালী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম শাখা থেকে পনির উদ্দিন আহমেদ চার দফায় আরও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা করেন রাঙ্গার সংসদ ভবন শাখার ব্যাংক হিসাবে। ব্যাংক লেনদেনের এই স্পষ্ট তথ্য-উপাত্তই এখন রাঙ্গার বিরুদ্ধে দুদকের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, এই টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর এবং রূপান্তরের মাধ্যমে আইনি জটিলতা আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন অভিযুক্তরা। তাদের এই কর্মকাণ্ড দণ্ডবিধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শীঘ্রই সংশ্লিষ্ট থানায় এই মামলা রুজু করা হবে।
এদিকে কেবল ঘুষ গ্রহণই নয়, মশিউর রহমান রাঙ্গার নামে বিপুল পরিমাণ সন্দেহভাজন অবৈধ সম্পদের তথ্যও মিলেছে দুদকের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৬(১) ধারায় তাকে একটি সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখন তাকে তার অর্জিত সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে হবে।
জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিবের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দলটির ভেতরেও বিষয়টি নিয়ে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগছে—নির্বাচন কেন্দ্রিক এই মনোনয়ন বাণিজ্য আর কত গভীরে প্রোথিত?
দুদক সূত্র জানায়, পনির উদ্দিন আহমেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই বিশাল অঙ্কের টাকা সরানোর পেছনে আরও কারো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক লেনদেনের নথিপত্র হাতে আসার পর এই মামলায় পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বললেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য যে, মশিউর রহমান রাঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন মালিক সমিতির নেতা হিসেবেও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও এবারই প্রথম দুদকের তদন্তে সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ মিলল।
দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানিয়েছেন, আইন সবার জন্য সমান। প্রভাবশালী হোক বা সাধারণ নাগরিক, দুর্নীতির প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। রাঙ্গার মামলার ক্ষেত্রেও তারা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পেশ করা হবে।
এখন দেখার বিষয়, এই আইনি লড়াইয়ে রাঙ্গা ও পনির উদ্দিন আহমেদ নিজেদের কতটা নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা কেবল দুজনের ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকেই পুনরায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

