সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বহুল প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন নিয়ে নাটকীয় মোড় নিয়েছে। নির্ধারিত ভোটের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর, সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে এবার পাল্টা লড়াইয়ে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টের দেওয়া চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ স্থগিত চেয়ে আজ সোমবার বিকেলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাদ্দাম হোসেন আজ বিকেলে আবেদনের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালতের নিয়ম অনুযায়ী যথাসময়ে এই আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে দুপুরে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দেন। আদালতের এই আকস্মিক আদেশে আগামীকাল ২০ জানুয়ারির নির্ধারিত ভোটগ্রহণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর শাবিপ্রবিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হাওয়া লেগেছিল। গত কয়েক দিন ধরে পোস্টার, ব্যানার আর স্লোগানে উত্তাল ছিল পুরো ক্যাম্পাস। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, আদালতের স্থগিতাদেশে সেখানে এখন জমাট বেঁধেছে গভীর হতাশা। ক্যাম্পাস জুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ—শেষ পর্যন্ত কি কাল ভোট হবে, নাকি আইনি মারপ্যাঁচে আটকে যাবে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা?
আদালতে আজ রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম ও ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আসাদ। অন্যদিকে শাবিপ্রবি প্রশাসনের পক্ষে আইনি লড়াই চালান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসাইন লিপু ও অ্যাডভোকেট মো. সাদ্দাম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। দুই পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাবের পর আদালত চার সপ্তাহের জন্য নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত দেন।
শুনানি শেষে ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচন কমিশন শাকসু নির্বাচনের জন্য যে সবুজ সংকেত দিয়েছিল, হাইকোর্ট তা চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেছেন। এই আদেশের ফলে আইনিভাবে আগামীকাল ভোটগ্রহণ সম্ভব নয়। তবে চার সপ্তাহ পর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুনরায় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করা যেতে পারে। এই আদেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ প্রার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মূলত এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটে গতকাল রোববার, যখন শাকসু নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভসহ তিন শিক্ষার্থী হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়। তাদের মূল যুক্তি ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ রাখার যে সাধারণ নির্দেশনা দিয়েছিল, তার মধ্যে এই নির্বাচন আয়োজন করা বিধিসম্মত নয়।
রিটকারীদের মতে, দেশে যখন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন সব ধরনের ভোট বন্ধের নির্দেশনা জারি করেছে, তখন একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আয়োজন আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই আদালত আজ নির্বাচন স্থগিতের প্রাথমিক আদেশ দেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করছে, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ নির্বাচনের এই বিধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়।
এদিকে, নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছিল অত্যন্ত তৎপর। এমনকি প্রার্থীদের বিশেষ অনুরোধে প্রচারণার সময়সীমা ১২ ঘণ্টা বাড়িয়ে আজ রাত ৯টা পর্যন্ত করা হয়েছিল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবুল মুকিত মোহাম্মদ মোকাদ্দেছ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল যে, প্রার্থীরা যাতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পান, সেজন্যই এই সময় বৃদ্ধি। কিন্তু বিকেলের আইনি মোচড় সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ১৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন থেকে তারা শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিশেষ অনুমতি পেয়েছিলেন। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই ২০ জানুয়ারি সকাল ৯টা থেকে ভোটগ্রহণের সকল প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। ব্যালট বক্স থেকে শুরু করে পোলিং অফিসার নিয়োগ—সবই ছিল শেষ পর্যায়ে। প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “সব আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার পর এমন আদেশ অনাকাঙ্ক্ষিত।”
শাবিপ্রবির এই নির্বাচন কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ঘটনা নয়, বরং এটি সারা দেশের ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি বড় বার্তা ছিল। দীর্ঘদিন পর কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছিলেন শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন আইনি এই অচলাবস্থা কত দ্রুত নিরসন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর ছাত্র রাজনীতির গতিপ্রকৃতি।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই আইনি লড়াইকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। অনেক সাধারণ ভোটারের মতে, রাজনৈতিক বা আইনি কারণে বারবার নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়া ছাত্র সংসদের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, রিটকারী শিক্ষার্থীদের অনুসারীরা মনে করছেন, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করেই নির্বাচনে যাওয়া উচিত। ক্যাম্পাসের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হলের ক্যান্টিন—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, “চেম্বার আদালত কী বলবে?”
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আজ বিকেলে দায়ের করা আবেদনের ওপর আগামীকাল সকালেই শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি চেম্বার আদালত হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের ওপর কোনো অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন, তবে কালকের ভোট গ্রহণে আর কোনো বাধা থাকবে না। তবে আদালতের রায় যদি স্থিতাবস্থার পক্ষে থাকে, তবে আগামী অন্তত এক মাস শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে নির্বাচনী প্রচারণার কোনো সুযোগ থাকছে না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকট এখন কেবল সিলেট নয়, বরং সুপ্রিম কোর্টের করিডোর পর্যন্ত পৌঁছেছে। সারা দেশের দৃষ্টি এখন চেম্বার আদালতের দিকে। ছাত্ররা কি কাল তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে পারবেন, নাকি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে—তার উত্তর মিলবে উচ্চ আদালতের পরবর্তী নির্দেশনায়।

