এক দশক পূর্বে রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত সহিংসতা, গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলায় একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরকে আগামী বছরের ১২ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে বহুল আলোচিত এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যুক্ত হলো।
রবিবার (৩০ নভেম্বর ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্য ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র অনুযায়ী, মামলার প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ্। শুনানিতে তিনি চলমান তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি বিশদভাবে উপস্থাপন করেন এবং শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির জন্য আবেদন জানান। তারেক আবদুল্লাহ্ উল্লেখ করেন যে অভিযুক্ত শাহরিয়ার কবির বর্তমানে অন্য একটি মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন। প্রসিকিউশনের আবেদন বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল ওয়ারেন্ট মঞ্জুর করে হাজিরা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করে দেন।
এই একই মামলায় এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনাল-১ নির্দেশ দিয়েছিল। একইসঙ্গে, পরবর্তী শুনানির জন্য ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করা হয়। এই পূর্ববর্তী নির্দেশনাটি ১২ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ প্রদান করেছিলেন।
এই মামলাটি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়। হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক, হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে এই অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে দাখিল করেছিলেন। অভিযোগে ঘটনার সময়কার সরকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে গণহত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই বহুল আলোচিত মামলায় মোট ২১ জন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে চারজন বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় আছেন। তারা হলেন: সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক। পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম।
মামলায় অভিযুক্ত বাকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক সাংসদ হাজী সেলিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (তৎকালীন) জিয়াউল আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার।
এছাড়াও, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সদস্য অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার, একাত্তর টিভির সাবেক সিইও মোজাম্মেল হক বাবু, সময় টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আহমেদ জোবায়ের, এবিনিউজ২৪ ডটকমের সম্পাদক সুভাস সিংহ রায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খান, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ এবং এনএসআইয়ের মো. মনজুর আহমেদ-কেও এই মামলার অভিযুক্তের তালিকায় রাখা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের এই সর্বশেষ আদেশটি দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিমণ্ডলে গভীর আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে ২০১৩ সালের এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া নতুন গতি পাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আগামী জানুয়ারিতে শাহরিয়ার কবিরের হাজিরা এবং তদন্ত প্রতিবেদনের পরবর্তী উপস্থাপনা মামলাটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

