রাজধানী ঢাকার উত্তরা ও সংলগ্ন এলাকাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে ফের বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে উত্তরা টঙ্গী ব্রিজের কাছে তিতাস গ্যাসের একটি সার্ভিস লাইনের ভালভ ফেটে উচ্চ চাপে গ্যাস লিকেজ শুরু হওয়ায় জননিরাপত্তার স্বার্থে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে রাত থেকেই উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখানসহ বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার পরিবার চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার রাতে এক জরুরি বার্তায় জানায়, উত্তরা টঙ্গী ব্রিজের কাছে অবস্থিত একটি শিল্প গ্রাহকের সার্ভিস লাইনের ভালভ ফেটে যাওয়ার ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্যাস বের হতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের উত্তরার প্রধান বিতরণ মেইন লাইনটি শাটডাউন করা হয়। ফলে পুরো উত্তরা এবং পার্শ্ববর্তী উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
ঢাকায় গত দুই সপ্তাহে এটি পাইপলাইন সংক্রান্ত তৃতীয় বড় দুর্ঘটনা। এর আগে গত ৪ জানুয়ারি আমিনবাজারে তুরাগ নদের তলদেশে একটি মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে প্রধান বিতরণ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ১০ জানুয়ারি মিরপুর রোডের গণভবনের সামনে আরেকটি ভালভ ফেটে গিয়ে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়।
পরপর এসব দুর্ঘটনায় ঢাকার অর্ধেকের বেশি এলাকায় কয়েকদিন ধরেই গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করছিল। আজ রাতের নতুন এই দুর্ঘটনার পর উত্তরের বাসিন্দাদের রান্না ও দৈনন্দিন কাজ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভালভটি প্রতিস্থাপনের কাজ রাত থেকেই দ্রুতগতিতে চলছে। মেরামত কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওইসব এলাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
পাইপলাইনের গ্যাসের সংকটের মধ্যে রাজধানীবাসীর শেষ ভরসা ছিল এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাস। কিন্তু সেখানেও দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন কৃত্রিম সংকট। আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে সরবরাহ কম থাকার অজুহাতে ডিসেম্বরের শেষ থেকেই বাজারে সিলিন্ডার গ্যাসের আকাল চলছে। অভিযোগ উঠেছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রাহকরা। আবার অনেক দোকানে বাড়তি টাকা দিয়েও গ্যাস মিলছে না।
তীব্র শীতের মধ্যে ঘরে পাইপলাইনের গ্যাস না থাকা এবং বাজারে সিলিন্ডারের অভাব—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে অনেকেই বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বাজারে এসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের চাহিদাও বেড়েছে কয়েক গুণ, যা স্বল্প আয়ের মানুষের বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর অনেক আবাসিক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। কোথাও রাত ২টা বা ৩টার পর গ্যাস এলেও ভোরেই তা চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির জন্য তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক অত্যন্ত পুরোনো হয়ে যাওয়ায় এ ধরণের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে এবং টেকসই সমাধান ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া কঠিন।
উত্তরা এলাকার বাসিন্দারা জানান, রাতের বেলা হুট করে গ্যাস চলে যাওয়ায় শিশুদের খাবার ও রাতের রান্নায় প্রচণ্ড সমস্যা হচ্ছে। মেরামত কাজ কতক্ষণে শেষ হবে, তা নিয়েও জনমনে সংশয় রয়ে গেছে।

