রাজধানীতে সক্রিয় একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারণা চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। রাজধানীর ভাটারা ও উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় পৃথক দুটি অভিযানে এই চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজনই চীনা নাগরিক। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের অর্ধ লক্ষাধিক সক্রিয় সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়, যা বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সাইবার অপরাধ বিরোধী সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— চীনা নাগরিক চেন লিং ফেং, জেং কং, জেং চাকিয়ার, ওয়েন জিয়ান কিউ এবং হুয়াং ঝেং জিয়াং। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি সদস্যরা হলেন— মো. জাকারিয়া (২৬), নিয়াজ মাসুম (২০) ও কামরুল হাসান ওরফে হাসান জয় (৩৮)। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিবি সাইবার উত্তরের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার।
ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম দীর্ঘদিন ধরে টেলিগ্রাম গ্রুপভিত্তিক বিভিন্ন জালিয়াতি ও অনলাইন চাকরির প্রলোভনের অভিযোগ তদন্ত করছিল। তদন্তে বেরিয়ে আসে, এই চক্রটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ। তারা কখনো ‘ঘরে বসে আয় করুন’ এমন বিজ্ঞাপনে মানুষকে আকৃষ্ট করত, আবার কখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অবিশ্বাস্য কম দামে দেওয়ার চটকদার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিত।
চক্রটি মূলত টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করে তাদের শিকার নির্বাচন করত। এক্ষেত্রে চীনা নাগরিকরা মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করলেও স্থানীয় বাংলাদেশি সদস্যরা ভাষাগত বাধা দূর করতে এবং সিম কার্ড সংগ্রহে সহায়তা করত। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে মোট ১৪টি ভিওআইপি গেটওয়ে ডিভাইস, ৪৭টি উন্নত প্রযুক্তির মোবাইল ফোন এবং অবিশ্বাস্যভাবে ৫১ হাজার ২৫১টি সক্রিয় সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় গত ৭ জানুয়ারি ভাটারা থানার একটি আবাসিক এলাকায়। সেখান থেকে নিয়াজ মাসুম ও কামরুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের হেফাজত থেকেই প্রথম দফায় অধিকাংশ সিম কার্ড এবং ১৪টি ভিওআইপি গেটওয়ে জব্দ করা হয়। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরে দ্বিতীয় দফার অভিযানে পাঁচ চীনা নাগরিকসহ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এই আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয় চীনা সফটওয়্যার সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ।
বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন ব্যক্তির বা চক্রের কাছে ৫১ হাজারেরও বেশি সিম কার্ড পৌঁছাল, তা নিয়ে খোদ ডিবি কর্মকর্তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই সিম কার্ডগুলো কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এর পেছনে টেলিকম ডিলার বা রিটেইল পর্যায়ে কারো গাফিলতি বা যোগসাজশ আছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
চক্রটির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ কীভাবে বিদেশে যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিবির সাইবার কর্মকর্তা জানান, অবৈধভাবে অর্জিত এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছিল। বিদেশি সফটওয়্যার এবং ভিওআইপি গেটওয়ে ব্যবহারের কারণে তাদের গতিবিধি শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ডিবি কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার সাধারণ নাগরিকদের অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “অপরিচিত কারো সঙ্গে বিকাশ বা অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংকিং মাধ্যমে লেনদেন করবেন না। বিশেষ করে টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে আসা কোনো লোভনীয় অফারে পা দেবেন না। অনেক ক্ষেত্রে এই চক্রটি সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও প্রতারণার কাজ চালাচ্ছে, ফলে অ্যাকাউন্টের আসল মালিক অজান্তেই আইনি জটিলতায় পড়ছেন।”
গ্রেপ্তারকৃত চীনা নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ এবং তারা কতদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম ব্যবহারের অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

