চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত নারকীয় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো অবস্থাতেই জামিন, অব্যাহতি বা খালাস না দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছাআ)। এই মর্মে সংগঠনটি সরকারের কাছে তিন দফা দাবি পেশ করেছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে সংগঠনটির সভাপতি রিফাত রশিদ এই ঘোষণা প্রদান করেন।
বিকেল ৩টার পর রিফাত রশিদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রসিকিউশনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়। বৈঠকে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা এবং বিচারাধীন মামলাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। প্রতিনিধি দলটি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের কাছে ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ও বিচার নিশ্চিতের বিষয়ে তাদের অনড় অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সামনে রিফাত রশিদ জুলাই-আগস্টের শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত তিন দফা দাবি তুলে ধরেন:
১. জামিন ও খালাস রোধ: জুলাই-আগস্টের গণহত্যার মামলায় অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি যেন কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে জামিন, মামলা থেকে অব্যাহতি বা চূড়ান্ত খালাস না পান, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের আটকাবস্থা বজায় রাখতে হবে।
২. সহযোগীদের বিচার: শুধুমাত্র সরাসরি হামলায় জড়িতরাই নয়, বরং জুলাই হত্যাকাণ্ডকে যারা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে, অর্থায়ন করেছে কিংবা উস্কানি দিয়েছে—সেই সব প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রসিকিউশনের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
৩. বিশেষ তদন্ত দল ও ট্রাইব্যুনাল গঠন: সারা দেশে সংঘটিত জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষ তদন্ত টিম’ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।
এদিন বৈঠকে প্রসিকিউশনের কাছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির পাটোয়ারীর জামিন বাতিলের দাবি জানান প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় অভিযুক্তের জামিন পাওয়াকে তারা শহীদদের স্মৃতির প্রতি অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, এদিন দুপুর ১২টায় পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত জামিন দেওয়ার প্রতিবাদে ‘বিপ্লবী ছাত্রজনতা’র ব্যানারে হাইকোর্ট মাজার গেটের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ ওই কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, তা আইনি কোনো মারপ্যাঁচে নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না। অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র সমাজ রাজপথ ছাড়বে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন ছাত্র সংগঠনের এই অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওপর তাদের নজরদারি আগামী দিনের বিচারিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করতে চাপ সৃষ্টি করবে। শহীদ পরিবারগুলোর পক্ষ থেকেও খুনিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হচ্ছে।

