আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সংকট নিরসনে একমত হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে তাদের নিজ নিজ দলের নির্বাচনী ইশতেহারে উপকূলের জীবন-জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। রোববার সকালে রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ‘উপকূলীয় মানুষের সংকট নিরসনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে নেতারা এসব কথা বলেন।
সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা নাহিদুল খান উপকূলের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সংকট। তবে আমাদের মতো দেশে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর।” তিনি দেশের মূল সম্পদ হিসেবে ‘জনগণ, জল ও জমিন’—এই তিনটি বিষয়কে চিহ্নিত করেন। নাহিদুল খান আরও বলেন, “আমাদের জনসংখ্যাই আমাদের প্রধান সম্পদ। উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আমাদের দল গুরুত্ব দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দেড় দশকের শাসনামলে উপকূলের মানুষ চরমভাবে অবহেলিত ছিল। আমরা সেই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে উপকূল রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করব।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির ঢাকা মহানগর নেতা মোহাম্মদ ওয়াহিদ আলম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে তাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে যাতে নোনাজলে ভাসা এই মানুষের জীবন আরও একটু উন্নত হয়। উপকূলের মানুষ কী চায়, সেটি বুঝতে হবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের অঙ্গীকার থাকবে তাদের দৈনন্দিন জীবিকা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আজকের এই সংলাপের প্রভাব আগামী দিনের নীতি-নির্ধারণে একটি ইতিবাচক ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে বাধ্য।”
বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা সীমা দত্ত তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি তোলেন। তিনি বলেন, “আমরা ঢাকা শহরে যারা নিরাপদ পরিবেশে থাকি, তারা কেবল বড় দুর্যোগের সময়ই উপকূলের কান্না শুনতে পাই। দুর্যোগ থেমে গেলে তাদের কষ্ট আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। অতীতে দলগুলো ক্ষমতায় এসে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের চেয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতেই বেশি ব্যস্ত ছিল।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো সুন্দরবন এবং উপকূলের পরিবেশের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব ফেলছে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য চরম ক্ষতিকর। সাধারণ মানুষকে এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষ থেকে মনির উদ্দিন পাপ্পু জানান, তারা জলবায়ু ও স্বাস্থ্য খাতের সংকট সমাধানে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, “আগামী ২০ জানুয়ারির পর আমরা আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করব। গত ১০-১৫ বছর ধরে আমরা উপকূলের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমাদের ইশতেহারে উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ প্রস্তাব থাকবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।”
বাসদ নেতা বজলুর রশিদ ফিরোজ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বিগত সরকারের আমলের জলবায়ু তহবিলের অর্থ নয়ছয়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ বাবদ আসা ৫০০ কোটি টাকার কোনো সঠিক হিসাব নেই। আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই টাকার উৎস ও ব্যয় নিয়ে তদন্ত করবে। বনাঞ্চল উজাড় এবং নদী দখলের ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছি। এই তহবিল কার পকেটে গেছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।”
ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংলাপে উপকূলীয় জেলাগুলোর নাগরিক প্রতিনিধি ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একমত হন যে, কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং উপকূলীয় সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং বাজেটে উপকূলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করাই হবে রাজনৈতিক দলগুলোর আসল পরীক্ষা।

