দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলেও, এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে কার্যকর সফলতা সম্ভব নয়। প্রাণিস্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিরাপদ আমিষের জোগান নিশ্চিত করতে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। বৃহস্পতিবার (০৮ জানুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘আহকাব ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক এক্সপো-২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
অ্যানিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আহকাব) উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী ভাষণে উপদেষ্টা বলেন, “উদ্যোক্তারা কেবল ব্যবসায়িক বিনিয়োগই করছেন না, বরং তারা দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আধুনিক ও বৈশ্বিক মানে উন্নীত করার সাহসী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।” তিনি আরও যোগ করেন যে, মাছ, গবাদিপশু কিংবা পোল্ট্রি—যেকোনো প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনের পূর্বশর্ত হলো সংশ্লিষ্ট প্রাণীর শারীরিক সুস্থতা ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
উপদেষ্টা ফরিদা আখতার তার বক্তব্যে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ ধারণার গুরুত্ব বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশ—এই তিনের পারস্পরিক সুস্থতা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এর যেকোনো একটি স্তরে ভারসাম্য নষ্ট হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তাই টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এই তিন খাতের সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।
তিনি কেবল প্রাণী মোটাতাজাকরণ বা উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব না দিয়ে নিরাপদ খাদ্যের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “প্রাণী কী খাচ্ছে, তা সরাসরি মানুষের শরীরে প্রভাব ফেলে। তাই প্রাণিখাদ্য ও মাছের খাদ্যের কাঁচামালের উৎস এবং গুণগত মান কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে। ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক বা রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ আমিষ উৎপাদনই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।”
কৃষি খাতের সঙ্গে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের গভীর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, পোল্ট্রি ও প্রাণিখাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ভুট্টা, সয়াবিনসহ অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। দেশেই এসব উপাদানের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি ডলার সাশ্রয় হবে এবং প্রান্তিক খামারিরা লাভবান হবেন।
আহকাবের সভাপতি সায়েম উল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট খাতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনব্যাপী এবারের আন্তর্জাতিক এক্সপোতে বিশ্বের ১৪টি দেশ অংশগ্রহণ করছে। প্রাণিস্বাস্থ্য ও মৎস্য খাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং নতুন বিনিয়োগ সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় মোট ১২৮টি বিদেশি স্টল এবং ৬৫ জন আন্তর্জাতিক প্রদর্শক তাদের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও পণ্য তুলে ধরছেন।
পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোও তাদের আধুনিক সেবা ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের মডেল প্রদর্শন করছে। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজন বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং পুষ্টি নিরাপত্তায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

