বিগত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীদের আইনি সুরক্ষা দিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো আইনি জটিলতা বা মামলা যাতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেজন্য একটি বিশেষ ‘দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) এক বিশেষ বার্তায় এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা জানান।
আইন উপদেষ্টা তার আনুষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত পোস্টে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আইন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে এই সংক্রান্ত অধ্যাদেশের প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে। আগামী মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। বিপ্লবীদের এই আত্মত্যাগ ও সাহসকে সম্মান জানাতে এবং তাদের আইনিভাবে নিরাপদ রাখাকে সরকারের ‘পবিত্র দায়িত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার বক্তব্যে এই আইনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, “জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশকে একটি স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছেন। তারা যখন শেখ হাসিনা সরকারের লেলিয়ে দেওয়া ঘাতক বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তখন তা ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রামের অংশ হিসেবে গৃহীত যেকোনো প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের জন্য তাদের সুরক্ষা দেওয়া বা দায়মুক্তি দেওয়া আমাদের নৈতিক ও আইনি কর্তব্য।”
এই ধরনের দায়মুক্তি আইন যে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে নজিরবিহীন কিছু নয়, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি জানান, সমসাময়িককালে আরব বসন্তসহ বিভিন্ন দেশে যখনই জনধিকৃত স্বৈরশাসকদের পতন হয়েছে, তখন পরবর্তী সময়ে বিপ্লবীদের সুরক্ষায় এমন দায়মুক্তি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সুরক্ষায় একই ধরনের দায়মুক্তি আইন কার্যকর হয়েছিল। এমনকি বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে জাতীয় স্বার্থে দায়মুক্তির আইন প্রণয়নের স্পষ্ট সাংবিধানিক বৈধতা রয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত বিভিন্ন রাজনৈতিক বা প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডকে আইনি আওতার বাইরে রাখা হবে। এর ফলে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো মামলা করার সুযোগ থাকবে না। উপদেষ্টার এই ঘোষণার মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থানের বীরদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হতে চলেছে এবং এটি বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবশেষে আসিফ নজরুল পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যে চেতনা নিয়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমেছিল, সেই ‘জুলাই চেতনা’কে সুরক্ষিত রাখা এবং বিপ্লবীদের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। উপদেষ্টামণ্ডলীর অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হবে, যা জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

