যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর নতুন করে ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত আরোপের বিষয়টিকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তবে আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বর্তমান ভাবমূর্তি ও ইমিগ্রেশন সমস্যার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে তিনি ‘অস্বাভাবিক’ বলে মনে করছেন না। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ সংক্রান্ত সরকারের অবস্থান ও নীতিগত দিকগুলো তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল বাংলাদেশের ওপর এই শর্ত আরোপ করেনি; বরং বিশ্বের ৩৮টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া বা ‘ওভারস্টে’ করার উচ্চ হারকে চিহ্নিত করেন। তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমেরিকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে যারা সুযোগ গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যখন কোনো দেশ তাদের অভিবাসন নীতি কঠোর করে, তখন যাদের ইমিগ্রেশন রেকর্ড দুর্বল, তাদের ওপর এই ধরনের বিধিনিষেধ আসাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।”
এই পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারের দায় কতটুকু—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই সমস্যা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়মের ফল। তিনি মন্তব্য করেন, “যদি এই পরিস্থিতি গত এক বছরের কর্মকাণ্ডে তৈরি হতো, তবে আমি বলতাম এই সরকারের দায় আছে। কিন্তু এই পদ্ধতি ও প্রবণতা গত কয়েক দশক ধরে চলছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলো পলিসিগতভাবে এই সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, মানুষের বিদেশ যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা বা প্রবণতা রাতারাতি কোনো সরকারের পক্ষেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে তৌহিদ হোসেন অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আজও আমরা প্রতিনিয়ত ভূমধ্যসাগরে মানুষের সলিল সমাধির খবর পাই। ভুক্তভোগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, “একজন মানুষ যখন ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে কেনিয়া বা তুরস্ক যায় এবং সেখান থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করে, তখন সে কেবল জীবনের ঝুঁকিই নেয় না, বরং দেশের আইনও ভঙ্গ করে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত এই অবৈধ পথ বন্ধ করতে না পারব, ততক্ষণ বিশ্বমঞ্চে আমাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হতেই থাকবে।”
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে বি১/বি২ (ব্যবসা ও পর্যটন) ভিসার জন্য সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার (প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা) পর্যন্ত জামানত দিতে হতে পারে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের জন্য এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই জামানত ফেরতযোগ্য হলেও ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় আর্থিক প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিসা বন্ড প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “বিষয়টি মাত্র আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সাধারণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাব।” তবে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য সবার আগে আমাদের ‘নিজের ঘর গোছাতে’ হবে এবং অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধ করতে হবে।

