রাজধানীর জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া গ্যাস পাইপলাইনটি মেরামত করতে গিয়ে বড় ধরনের যান্ত্রিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি সংস্কারের সময় ভেতরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নদীর পানি ঢুকে পড়ায় পুরো ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে একদিকে যেমন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে শীতকালীন চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় রাজধানী ঢাকা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে শিল্পোৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের অস্বাভাবিক স্বল্পচাপের কারণে নগরজীবনে নেমে এসেছে চরম নাভিশ্বাস।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কথা গ্রাহকদের অবহিত করেছে। তিতাস জানায়, সম্প্রতি সাভারের আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদীর তলদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতরণ পাইপলাইন মালবাহী ট্রলারের নোঙরের আঘাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ এবং বিআইডব্লিউটিএর কারিগরি সহায়তায় আমিনবাজার ডিআরএস (ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন) সংলগ্ন ওই ১২ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটিতে ‘লিক রিপেয়ার ক্ল্যাম্প’ স্থাপনের মাধ্যমে মেরামতের কাজ চলছিল। কিন্তু বুধবার লিক বন্ধ করার চূড়ান্ত পর্যায়ে পাইপলাইনের ভেতরে নদীর পানি ঢুকে পড়ে। পাইপলাইনে বাতাস বা গ্যাসের পরিবর্তে পানির উপস্থিতি সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পুরো রাজধানীর গ্যাস নেটওয়ার্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই যান্ত্রিক বিভ্রাটের প্রভাবে রাজধানীর গাবতলী, মোহাম্মদপুর, আদাবর, ধানমন্ডি, আজিমপুর, মিরপুর ও পুরান ঢাকাসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় চুলা একেবারেই জ্বলছে না, আবার কোথাও চাপের পরিমাণ এতটাই কম যে স্বাভাবিক রান্নাবান্না করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, ভোরের দিকে সামান্য সময়ের জন্য গ্যাসের দেখা মিললেও দিনের বেশিরভাগ সময় হাহাকার করতে হচ্ছে।
ফলে নিরুপায় হয়ে নগরবাসীকে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে দীর্ঘ লাইনের কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বহুগুণ বেড়েছে। অনেকে বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের চেষ্টা করলেও বাজারে এসব পণ্যের বাড়তি দাম ও সিলিন্ডার সংকটের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইন থেকে পানি অপসারণ এবং চাপ স্বাভাবিক করার জন্য তাদের বিশেষ কারিগরি দল নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে লাইনের ভেতরে জমে থাকা পানি সম্পূর্ণ বের করে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সময়সাপেক্ষ বিষয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি জটিলতার জন্য তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার আশ্বাস দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নদীর তলদেশে থাকা পাইপলাইনগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর তদারকি না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। শীতের তীব্রতার সাথে যোগ হওয়া এই গ্যাস সংকট রাজধানীর জনজীবনে স্থবিরতা নিয়ে এসেছে। তিতাসের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, মেরামত কাজ সফল হলে এবং সামগ্রিক সরবরাহ বাড়লে আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

