বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাষ্ট্র কাঠামোতে মৌলিক এবং ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তন দেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে বিদ্যমান সকল প্রকার বৈষম্য দূর করে একটি নতুন ধারার সূচনা করবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সমর্থনে শ্রীনগরের রায় বাহাদুর শ্রীনাথ ইনস্টিটিউট খেলার মাঠে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজিত এক মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তাঁর বক্তব্যে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষে মানুষে কোনো ভেদ থাকবে না। তিনি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেন, রাষ্ট্র কাঠামোতে যাতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়—পুরুষ-নারীর বৈষম্য দূর হয়, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো বিভেদ না থাকে এবং ধনী-গরিবের অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পায়।
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের এই বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে দেশের সকল নাগরিককে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি সরকার পরিবর্তন করবে না, বরং দেশের মূল গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিকেও শক্তিশালী করবে।
তবে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দাবি করেন, দেশে এখন একটি ‘অপর শক্তি’ সক্রিয় রয়েছে, যা মূলত ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’। এই সাম্প্রদায়িক শক্তি যদি দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে দেশের মানুষ কী ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে, তা নিয়ে তিনি গুরুতর সতর্কতা উচ্চারণ করেন।
তিনি ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করে বলেন, “আজকে আওয়ামী লীগ নাই, পালিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের নেতারাও মাঠে নাই, পালিয়ে গেছে।” তাঁর দাবি অনুযায়ী, দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে ব্যাহত করতে এবং রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগাতে সেই সুযোগে সাম্প্রদায়িক শক্তি একত্রিত হচ্ছে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এই ইঙ্গিত দেন যে, বিএনপি কেবল গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্যই লড়ছে না, বরং এই অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান রোধ করার জন্যও তারা বদ্ধপরিকর।
সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি দেশনেত্রীর আশু আরোগ্য কামনা করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি রাজনীতির একটি সংবেদনশীল দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যদি দেশনেত্রী না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও সংশয় দেখা দেবে।” এই মন্তব্য দ্বারা তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়ার উপস্থিতি ও সক্রিয়তা এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অনুপস্থিতি বা শারীরিক অবনতি দেশের সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই মহাসমাবেশে এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন আলী আজগর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ বিশুদ্ধ নন্দন চক্রবর্তী। প্রধান অতিথি গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ছাড়াও সমাবেশে বক্তব্য দেন মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। বক্তারা সকলেই এই অঞ্চলের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই বক্তব্য বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের একটি অংশ। এর মাধ্যমে তারা একদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের সুরক্ষা ও সমতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের কথিত অনুপস্থিতি এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির ঝুঁকির কথা তুলে ধরে নিজেদেরকে গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই নির্বাচনকে তারা কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছে।
