সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সততা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে নীলফামারীতে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে লিখিত পরীক্ষায় প্রক্সি (অন্যের দ্বারা পরীক্ষা দেওয়ানো) জালিয়াতির মাধ্যমে উত্তীর্ণ হওয়া দুই পরীক্ষার্থীকে মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসে প্রশাসনের হাতে আটক হতে হয়েছে। শনিবার (২৯ নভেম্বর) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ভাইভা বোর্ডের কঠোর নজরদারিতে এই গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে এবং সেখানেই তাদের আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলেন ডোমার উপজেলার ভোগডাবুড়ি চিলাহাটি এলাকার শাহাদাত হোসেনের ছেলে মো. হৃদয় ইসলাম (১৯) এবং ডিমলা উপজেলার সুন্দরখাতা বালাপাড়া এলাকার মো. বাবুল হোসেন (৩০)। এই ঘটনা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ লাভে প্রক্সি চক্রের অব্যাহত অপতৎপরতা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মধ্যেকার চলমান সংঘাতকে আবারও সামনে নিয়ে এলো।
এই জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পদ্ধতি প্রশাসনিক কঠোরতার এক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জানা যায়, মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা বোর্ডে পরীক্ষার্থীদের হাজির হওয়ার পর বোর্ডের সদস্যরা একটি গুরুত্বপূর্ণ যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করেন। তাদের মূল হাতের লেখার সঙ্গে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রের হাতের লেখা নিবিড়ভাবে মিলিয়ে দেখা হয়। এই তুলনামূলক পরীক্ষার সময়ই আটককৃত দুই পরীক্ষার্থীর হাতের লেখার সঙ্গে তাদের লিখিত পরীক্ষার খাতার লেখার সুস্পষ্ট অমিল ধরা পড়ে।
সন্দেহ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে দুই পরীক্ষার্থীই শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন যে, তারা নিজেরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেননি। উচ্চমূল্যের বিনিময়ে প্রক্সি বা ভাড়া করা লোক দিয়ে তারা লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং সেই জালিয়াতির মাধ্যমেই তারা লিখিত পরীক্ষায় পাস করেন। প্রশাসনের এই সফল ও কার্যকর যাচাই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমেই নয়, বরং খুঁটিনাটি বিষয় যাচাইয়ের মাধ্যমেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা করা সম্ভব।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা প্রহরী এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে এই লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অফিস সহায়ক পদে মোট ৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে ১৩০ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এছাড়াও নিরাপত্তা প্রহরীর ৩ পদের বিপরীতে ৯ জন এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ১টি পদের বিপরীতে ৩ জন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন। শূন্যপদের তুলনায় বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর তীব্র প্রতিযোগিতা থেকেই অনুমান করা যায়, কেন এই ধরনের প্রক্সি জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। স্বল্পসংখ্যক সরকারি পদের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় অসাধু চক্রকে অবৈধ পথে নিয়োগ লাভের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
এ বিষয়ে নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “দুই পরীক্ষার্থীকে জেলা প্রশাসনের হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার পবিত্রতা নষ্ট করার চেষ্টার জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।”
জেলা প্রশাসকের এই দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মান বজায় রাখার প্রতি প্রশাসনের দৃঢ় অঙ্গীকারকে তুলে ধরে। সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন ভবিষ্যতেও যেকোনো প্রকার জালিয়াতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশা করছে।
এই ধরনের ঘটনা কেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং যোগ্য ও প্রকৃত মেধার অধিকারী পরীক্ষার্থীদের ন্যায্য সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করে। তাই নিয়োগ কর্তৃপক্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত, শুধু প্রক্সি দেওয়া পরীক্ষার্থীদের নয়, বরং এর পেছনে সক্রিয় থাকা শক্তিশালী প্রক্সি চক্র বা সিন্ডিকেটগুলোকেও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করা যায়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বা ডিজিটাল স্বাক্ষর যাচাইয়ের মতো আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই ধরনের প্রতারণা বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

