বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা রুখতে এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য বলে মত প্রকাশ করেছেন সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। রবিবার (৩০ নভেম্বর ২০২৫) রংপুরে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কর্তৃক আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এই মত উঠে আসে।
রংপুর নগরীর একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ: নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী-সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, জনপ্রতিনিধি সহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজ যে পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে, সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। তাদের মতে, কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর পরিবর্তন। যদি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ক্ষেত্রে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়, তবে দেশে আবারও পুরোনো শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন কিংবা স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাবে।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা একটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন সাংবিধানিক কাঠামো দাঁড় করানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা মত দেন যে, এই কাঠামোর ভিত্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ হবে একটি জবাবদিহিমূলক, জনকল্যাণমূলক এবং বৈষম্যহীন উন্নত দেশ।
আলোচকরা জোর দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। তবে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার মাঝে পারস্পরিক ঐক্য ও সহনশীলতা বজায় থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সচেতন ও সংগঠিত নাগরিক সমাজের কোনো বিকল্প নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে ব্যর্থ হলে কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন আসবে না।
অংশগ্রহণকারীরা গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সংস্কার কার্যক্রম, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিচার, সংবিধানের সমসাময়িকীকরণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মতামত দেন। এছাড়া বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
তরুণ ভোটারদের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেন যে, “একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দুটি আলাদা প্রেক্ষাপট। এই দুটিকেই ধারণ করে আমাদের দেশের জন্য কাজ করতে হবে, যাতে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।”
সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে অন্যদের মধ্যে সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হায়দার স্বাধীন এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্টের রংপুর অঞ্চল সমন্বয়কারী রাজেশ দে রাজু বক্তব্য দেন। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন।
আয়োজক সংগঠন সুজন জানিয়েছে, এই গোলটেবিল থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দল ও প্রার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যাতে নাগরিক সমাজের এই গুরুত্বপূর্ণ মতামতগুলো যথাযথভাবে প্রতিফলিত ও মূল্যায়িত হয়।

