বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন এবং প্রস্তাবিত গণভোটকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় এক্সটারনাল অ্যাকশন সার্ভিসের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পাম্পালোনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি দেশের চলমান রাজনৈতিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে এই মন্তব্য করেন।
অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের বিবর্তন, প্রস্তাবিত সমন্বিত অংশীদারিত্ব চুক্তি এবং দেশের আসন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
বৈঠকের শুরুতে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসন ও স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে এদেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি কাটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় আপামর জনতা দেখিয়েছে, তার পূর্ণতা পাবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে।
প্রধান উপদেষ্টা বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা তথা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আসন্ন গণভোটে তারা ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করবে। কোনো রাজনৈতিক দলই জনগণের এই আকাঙ্ক্ষার বিপক্ষে গিয়ে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে আশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন উৎসবমুখর পরিবেশে এবং নির্ভয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার বদ্ধপরিকর।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি পাওলা পাম্পালোনি গত ১৭ মাসে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত ‘অসাধারণ ও ব্যাপক’ সংস্কার কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা কেবল প্রশংসনীয়ই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং শুরু থেকেই এই সংস্কার উদ্যোগে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছে। পাওলা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য কেবল একটি ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রই নয়, বরং অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারও বটে। তাই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর উন্নয়ন ইইউর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়।
বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ‘সমন্বিত অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা কাঠামো চুক্তি’ বা পিসিএ সংক্রান্ত আলোচনা। পাওলা পাম্পালোনি জানান, ২০ বছর ধরে সাধারণ অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে দুই পক্ষের সম্পর্ক পরিচালিত হলেও ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে একে আরও বিস্তৃত ও গভীর করার লক্ষ্যে পিসিএ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই চুক্তি সম্পাদিত হলে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা এই অগ্রগতির জন্য সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, পিসিএ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের উন্নয়নে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। তিনি গত দেড় বছরে ইইউর নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পায়। পাওলা পাম্পালোনি এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সংহতি জানিয়ে ইইউ একটি উচ্চপর্যায়ের বৃহৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই মিশনের প্রধান চলতি সপ্তাহেই ঢাকা সফরে আসবেন এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করবেন। ইইউ প্রতিনিধি দল মনে করে, একটি সফল এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যদি তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্পন্ন করতে পারে, তবে ঢাকা ও বিশ্বের এই বৃহত্তম অর্থনৈতিক জোটের সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছাবে। এটি হবে দুই পক্ষের মধ্যকার সম্পর্কের একটি নতুন ও শক্তিশালী অধ্যায়ের সূচনা।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাওলা পাম্পালোনি ও প্রধান উপদেষ্টা একমত পোষণ করেন যে, দুই পক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও আইনি কাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।
সেইসঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার বহুমুখীকরণ এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে বর্তমান সরকার যে সংস্কার পদক্ষেপ নিয়েছে, তাকে স্বাগত জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের সংস্কার কার্যক্রম সফল করার মূল লক্ষ্যই হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আস্থার সাথে কাজ করতে পারবেন।
আলোচনা শেষে প্রধান উপদেষ্টা আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, আসন্ন নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং এটি ১৬ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে মানুষের ক্ষমতায়নের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
সরকারের সংস্কারগুলোর সুফল যেন প্রতিটি নাগরিক ভোগ করতে পারে, সেই লক্ষ্যেই তার প্রশাসন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পাওলা পাম্পালোনি বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে ইইউর পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, এসডিজি বিষয়ক সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন। তারা উভয়েই দুই পক্ষের আলোচনার অগ্রগতির প্রশংসা করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া নতুন অংশীদারিত্ব চুক্তিটি এশিয়ার এই অঞ্চলে একটি মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত হবে। দিনের শেষে এই বৈঠকটি বাংলাদেশের বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে।

