বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনির হায়দার। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আসন্ন গণভোটে যদি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, তবে দেশে ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন কেউ ঠেকাতে পারবে না। বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণভোট: ২০২৬, কী এবং কেন?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
মনির হায়দার বলেন, “ভোটের ফলাফল দুই প্রকার হতে পারে—বিজয় অথবা পরাজয়। গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়ে ‘না’ জয়যুক্ত হয়, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের অন্ধকার যুগ আবারও ফিরে আসবে। আমাদের এই জুলাই সনদ মূলত ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর একটি কার্যকর ব্যবস্থাপত্র বা ‘প্রেসক্রিপশন’। আমরা যদি এই সনদকে জনগণের অনুমোদনের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে বাস্তবায়ন করতে না পারি, তবে সেই ব্যর্থতার জন্য আমরাই দায়ী থাকব।”
বক্তব্যে মনির হায়দার জুলাই জাতীয় সনদের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই সনদ কোনো আকস্মিক চিন্তা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে গভীর আলোচনা ও গবেষণার ফসল। তিনি বলেন, “জুলাই সনদকে একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মাসের পর মাস শলাপরামর্শ করে এটি তৈরি করেছে। এটি মূলত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।”
গণভোটকে কেন্দ্র করে স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টার এই বিশেষ সহকারী। তিনি অভিযোগ করেন যে, ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়া শক্তির আর্থিক ক্ষমতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। মনির হায়দার বলেন, “যারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, তাদের কাছে লুটপাটের অঢেল অর্থ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি কায়মি স্বার্থবাদী চক্র তাদের মদত দিচ্ছে। এই দুই শক্তি একত্রিত হয়ে জুলাই সনদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য নেতিবাচক ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাধারণ ভোটারদের কাছে এখনো জুলাই সনদের অনেক বিষয় অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে যাতে কোনো অশুভ শক্তি ফায়দা তুলতে না পারে, সেজন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি পরিচালিত হবে। এই গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবেন যে, তারা জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াগুলো সমর্থন করেন কি না। এতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা রয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে সুজন নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য আলোচকরা গণভোটের আইনি ও রাজনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা একমত হন যে, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সুশাসিত সমাজ প্রতিষ্ঠায় জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। মনির হায়দারের এই কঠোর বার্তা মূলত সেই পরিবর্তনের ধারাকে চিরস্থায়ী করার এবং পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর একটি জোরালো রাজনৈতিক আহ্বান হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

