আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) পরিচালিত এই জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী। সোমবার বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন দেশজুড়ে নির্বাচনী আমেজ তুঙ্গে এবং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রচার-প্রচারণা জোরদার করছে।
ইএএসডির জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের একটি বিশাল অংশ বিএনপির পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন। বিএনপি এককভাবে ৭০ শতাংশ সমর্থন পেলেও অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৯ শতাংশ এবং নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২.৬ শতাংশ জনসমর্থন পেয়েছে। এছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্মিলিতভাবে ৫ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ০.২ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে অনিচ্ছুক বলে জানিয়েছেন, যা আসন্ন নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেরই ইঙ্গিত দেয়।
সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হায়দার তালুকদার জরিপের ফলাফল তুলে ধরে জানান, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে সশরীরে ২০ হাজার ৪৯৫ জন ভোটারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। জরিপের পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই তথ্যের পেছনে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও সরাসরি মাঠ পর্যায়ের মতামত কাজ করেছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি। প্রায় ৭১ শতাংশ নারী ভোটার বিএনপির প্রতি তাদের আস্থার কথা জানিয়েছেন, যা দলটির জন্য একটি শক্তিশালী ভোটব্যাংকের ইঙ্গিত বহন করে।
ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে বিএনপির জনসমর্থন সবথেকে বেশি, যেখানে প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। এই দুই বিভাগে যথাক্রমে ২৯ ও ২৫ শতাংশ ভোটার জামায়াতের প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টি অন্যান্য এলাকার তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থেকে ৫.২ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে, যদিও জাতীয়ভাবে দলটির সার্বিক সমর্থন দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৪ শতাংশে।
এই জরিপের সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো সাবেক আওয়ামী লীগ ভোটারদের রাজনৈতিক ঝোঁক পরিবর্তন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের পূর্ববর্তী ভোটারদের ৬০ শতাংশই এখন বিএনপিকে ভোট দিতে আগ্রহী। এছাড়া তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ জামায়াতকে এবং ১৫ শতাংশ অন্যান্য দলকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেছেন। অংশগ্রহণকারীরা বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করে এই পরিবর্তন এনেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে চেয়েছিলেন এমন ভোটারদের একটি বড় অংশই এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছেন।
ভবিষ্যৎ সরকার গঠন ও আসনভিত্তিক জয়ের সম্ভাবনা নিয়েও সাধারণ মানুষের মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন আসন্ন নির্বাচনের পর বিএনপিই সরকার গঠন করবে। বিপরীতে ১৭ শতাংশ মানুষ জামায়াতের সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখেন। একইভাবে, ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা বিশ্বাস করেন তাদের নিজ নিজ আসনে বিএনপির প্রার্থীরাই জয়ী হবেন। সাধারণ মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন ঘিরে ইএএসডির জরিপ একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও জরিপ ও বাস্তব ফলাফল সবসময় এক হয় না, তবুও জনগণের এই গণরায়ের প্রতিফলন আসন্ন ভোটের দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশায় থাকা সাধারণ মানুষের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

