রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, সেখানে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই উপশহরে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের বসতি গড়ে উঠবে।
শুধু আবাসিক এলাকাই নয়, এখানে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, কূটনৈতিক এলাকা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বড় বড় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশের একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, পূর্বাচল এলাকাকে কেন্দ্র করে ডিএমপির অধীনে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী বিভাগ গড়ে তোলার কাজ প্রক্রিয়াধীন। প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পুরো পূর্বাচলকে একটি অপরাধ বিভাগ, একটি গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি), একটি ট্রাফিক বিভাগ এবং একটি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) বিভাগের অধীনে ভাগ করা হবে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিগত নজরদারির জন্য একটি বিশেষ এমআইএস বা আইটি ইউনিট এবং একটি পূর্ণাঙ্গ পুলিশ লাইনস স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো উপশহরকে প্রশাসনিকভাবে দুটি অপরাধ জোন ও চারটি ট্রাফিক জোনে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিবিড় পর্যবেক্ষণে স্থাপন করা হবে চারটি প্রধান থানা। এই থানাগুলো হচ্ছে— ব্রাহ্মণখালী, পশি, বরকাউ এবং পারাবার্থা। প্রতিটি থানায় গড়ে ১০৪ জন করে দক্ষ পুলিশ সদস্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি এবং পুরো এলাকার কৌশলগত স্থানে ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপন করা হবে।
এই বিশাল প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য জনবল কাঠামোতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে মোট ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ডেপুটি কমিশনার (ডিসি), অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার (এডিসি), সহকারী কমিশনার (এসি) থেকে শুরু করে পরিদর্শক, উপ-পরিদর্শক এবং কনস্টেবল পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা ও কর্মী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিপুল এই জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পূর্বাচলকে অপরাধমুক্ত এবং যানজটমুক্ত একটি মডেল সিটিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা অবকাঠামোর পাশাপাশি এই মেগা প্রজেক্টে যানবাহনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক টহল গাড়ি, দ্রুতগতির মোটরসাইকেল এবং উদ্ধারকাজে ব্যবহারযোগ্য ভারী যানবাহন টিওঅ্যান্ডই (Table of Organization and Equipment) ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে করে যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে পুলিশি সেবা নিশ্চিত করা যায়।
পূর্বাচল নিয়ে এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, “পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পকে আমরা শুরু থেকেই একটি আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ নগরী হিসেবে দেখতে চাই। এখানে যে বিপুল জনসংখ্যা ও স্পর্শকাতর স্থাপনা থাকবে, তার জন্য প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামো প্রয়োজন। সে কারণেই ডিএমপির অধীনে এই মেগা প্রজেক্টের প্রস্তাবনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনিক ও অর্থ বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। বিশেষ করে পূর্বাচল এলাকায় ইতিমধ্যে প্লট বরাদ্দ পাওয়া বাসিন্দারা নিরাপত্তা শঙ্কায় বাড়ি নির্মাণে যে দ্বিধা বোধ করছেন, এই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে সেই শঙ্কা দূর হবে এবং আবাসন প্রক্রিয়া গতিশীল হবে।
রাজধানীর মূল কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই মেগা সিটিতে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র গড়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাসহ বড় বড় বাণিজ্যিক প্রদর্শনী ইতিমধ্যে পূর্বাচলে শুরু হয়েছে। এ ধরনের বৈশ্বিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকায় অপরাধ দমন এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে একটি চৌকস ডিবি বিভাগ ও আইটি ইউনিট থাকা অপরিহার্য বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই আইটি ইউনিট পুরো এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল নজরদারি তদারকি করবে, যা একটি ‘স্মার্ট সিকিউরিটি সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করবে।
পূর্বাচলকে ডিএমপির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার একটি অপরিহার্য অংশ। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত প্রচেষ্টায় এবং পুলিশের এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে পূর্বাচল আগামী দিনের বসবাসের জন্য দেশের অন্যতম নিরাপদ গন্তব্য হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

