বাংলাদেশে গত দেড় দশকে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এগুলো ছিল সুপরিকল্পিত ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অপরাধ। আজ রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া ‘গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে গুমের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে কমিশন।
কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে সদস্যগণ প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার সময় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও শনাক্তকরণে এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কমিশন তাদের তদন্তে গুমের যে ভয়াবহ চিত্র পেয়েছে, তার কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ নিচে তুলে ধরা হলো: মোট অভিযোগ: ১,৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। গুম হিসেবে স্বীকৃত: যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞানুযায়ী ‘গুম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রেণিবিভাগ: এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ (নিখোঁজ ও মৃত) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্তসম্ভাব্য সংখ্যা: কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, প্রকৃত গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে, কারণ অনেকে এখনো ভয়ে বা প্রবাসে থাকায় যোগাযোগ করেননি।
কমিশন স্পষ্ট করেছে যে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের সিংহভাগই ছিল তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। জীবিত ফিরে আসা: ফিরে আসা ব্যক্তিদের ৭৫% জামায়াত-শিবির এবং ২২% বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। এখনো নিখোঁজ: নিখোঁজদের ৬৮% বিএনপি এবং ২২% জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
সরাসরি নির্দেশদাতা: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে অনেক ক্ষেত্রে গুমের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম ও আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মতো হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগসূত্র মিলেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, গুমের শিকার ব্যক্তিদের হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ব্যবহার করা হতো। প্রধান বধ্যভূমি: বরিশালের বলেশ্বর নদী। তদন্ত অনুযায়ী, এখানে শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য স্থান: বুড়িগঙ্গা নদী এবং মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুম করার প্রমাণ মিলেছে। রেন্ডিশন: গুমের শিকার ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) তথ্যও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। এই ঘটনাগুলো এক কথায় ‘পৈশাচিক’। বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, এই রিপোর্ট তার ডকুমেন্টেশন।”
তিনি এই নৃশংসতার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য এর প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। এছাড়া, আয়নাঘরের পাশাপাশি গুম ও হত্যাকাণ্ডের জায়গাগুলো ম্যাপিং করার জন্য কমিশনকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন তিনি।
পরবর্তী পদক্ষেপ: কমিশন সদস্যদের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে এই কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া এবং ভিক্টিমদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে।

