ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আজ শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। এই নিয়ে হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে তৃতীয় দফায় রাজপথে নামলেন তাঁরা। জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেয়। আন্দোলনকারীদের অবস্থানের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ মোড় দিয়ে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা পুরো এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তীব্র ভাষায় এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি তোলেন। শাহবাগের রাজপথে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভকারীরা হাদি হত্যার বিচার চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের রাজনৈতিক দলগুলোর সাম্প্রতিক গতিবিধি এবং দেশের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। বিভিন্ন দেশের সাথে সংলাপের বিষয়ে ইঙ্গিত করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যদি কোনো দেশের বৈঠক হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ এবং জনগণের সামনে উন্মুক্ত। কোনো প্রকার গোপনীয়তা বা পর্দার অন্তরালের সমঝোতা দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
আবদুল্লাহ আল জাবের তাঁর বক্তব্যে সরাসরি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে তিন দিক থেকেই প্রতিবেশী ভারতের সীমান্ত ও প্রভাব বিদ্যমান। এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই দীর্ঘদিনের। তবে তিনি কেবল একপাক্ষিক বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জানান, যদি আমেরিকা বা অন্য কোনো শক্তিশালী দেশ বাংলাদেশে আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করে, তবে ইনকিলাব মঞ্চ সমানভাবে তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো বিদেশি শক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়া হবে না—এমন কঠোর বার্তা দেন তিনি। তাঁর মতে, ইনকিলাব মঞ্চের এই আন্দোলন কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে নয়, বরং এটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষার বৃহত্তর লড়াইয়ের একটি সূচনা মাত্র।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির অবদানের কথা স্মরণ করে জাবের বলেন, হাদি যে ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা বাংলাদেশের অধিকারকামী মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। তিনি যে লড়াকু মানসিকতা রেখে গেছেন, সেই আদর্শকে ধারণ করেই সামনের দিনগুলোতে রাজপথের সংগ্রাম আরও জোরালো করা হবে। ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের আধিপত্যবাদী অপশক্তিকে শিকড় গাড়তে দেওয়া হবে না। হাদি হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এবং আধিপত্যবাদের বিষদাঁত উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।
অবরোধ চলাকালে শাহবাগ এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। বিক্ষোভকারীদের অবস্থানের কারণে দীর্ঘ সময় যানজট সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষকে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হলেও আন্দোলনের গুরুত্ব বিবেচনা করে অনেককেই সহমর্মিতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হয়, তবে আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তারা কেবল বিচার নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম রাজনীতিতে একটি টেকসই পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন।
বিকেলের দিকে আন্দোলনকারীরা তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি সমাপ্ত করে এবং আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। শহীদ হাদির স্মরণে এবং বিচারের দাবিতে আয়োজিত এই বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত একটি জাতীয় ঐক্য ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সংহতির রূপ নেয়। দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ ছাত্ররা এই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অঙ্গীকার করেন। দিনের শেষে শাহবাগ মোড় থেকে মিছিলটি সরিয়ে নেওয়া হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তবে আন্দোলনকারীদের দেওয়া আলটিমেটাম রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

