বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি মরহুমার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও দেশপ্রেমের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বেগম খালেদা জিয়ার সমুজ্জ্বল অবদান জাতি চিরকাল অত্যন্ত বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।
আজ ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই প্রয়াণে দেশজুড়ে নেমে আসা শোকের ছায়ার মধ্যে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আজ সমগ্র জাতি গভীর শোক ও বেদনায় নিস্তব্ধ। বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষ এই জননেত্রীর চলে যাওয়া দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক পরম মহিমান্বিত প্রতীক। তাঁর জীবন ছিল সাধারণ মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত এবং তাঁর নেতৃত্ব ছিল আদর্শিক রাজনীতির এক অনুপম উদাহরণ।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। বিশেষ করে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর যে আপসহীন অবস্থান ছিল, তা বারবার জাতিকে অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে এবং গণমানুষকে মুক্তির প্রেরণা যুগিয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, দেশের সংকটাপন্ন মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়ার অবিচল নেতৃত্ব ও সাহসিকতা গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর মতো একজন মহান অভিভাবককে হারিয়ে আজ জাতি নিঃস্ব বোধ করছে।
বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংসদীয় রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, তাঁর তিনবারের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তার সুফল আজ জাতি ভোগ করছে।
তৃণমূল পর্যায়ে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপগুলো এ দেশের উন্নয়নের মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন, বেগম জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশ একজন জনদরদী ও দূরদর্শী নেত্রীকে হারিয়েছে, যার অভাব পূরণ হওয়া প্রায় অসম্ভব।
দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই শোকের সময়ে আমাদের সবার কর্তব্য হলো মরহুমার স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। তিনি সকলকে যার যার অবস্থান থেকে মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করার জন্য অনুরোধ জানান।
তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করে বলেন, তাঁর শোকবিহ্বল অনুসারীদের জন্য এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন, তবে তাঁর দেখানো গণতান্ত্রিক পথ ও আদর্শই তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণের সমাপ্তিতে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এ দেশের মা ও মাটির সাথে মিশে থাকা এক নেতৃত্ব। দীর্ঘ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর আজ ভোরে তাঁর জীবনাবসান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার এই মহান নেত্রীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বিশ্বাস করেন, বেগম জিয়ার আদর্শ ও দেশপ্রেম আগামী প্রজন্মের কাছে দেশ গড়ার এক অদম্য অনুপ্রেরণা হয়ে টিকে থাকবে।

