বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে তিনি বলেন, গণতন্ত্র রক্ষা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বেগম জিয়ার সমুজ্জ্বল ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরম মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশে তাঁর অবদান অনন্য। বিশেষ করে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব বারবার জাতিকে পথ দেখিয়েছে এবং মুক্তির প্রেরণা জুগিয়েছে।”
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার স্মৃতিচারণ করে বলেন, মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখতে বেগম জিয়ার দৃঢ় অবস্থান চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরও যোগ করেন, “এমন একজন মহান, দূরদর্শী এবং নিখাদ দেশপ্রেমিক নেত্রীর প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হবার নয়। জাতি আজ এক মহান অভিভাবককে হারিয়েছে।”
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে বেগম খালেদা জিয়াকে বহু চড়াই-উতরাই ও নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে কারান্তরীণ থাকা অবস্থায় সুচিকিৎসার অভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটে। লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে পূর্ণ মুক্তি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি তিনি লন্ডনে যান এবং দীর্ঘ ১১৭ দিন সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত মে মাসে দেশে ফেরার পর তাঁর স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেও বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর পুনরায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে এক মাসেরও বেশি সময় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আজ ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে দেশবাসীকে ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় সবাই যেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে দোয়া করেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন যে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এবং জাতীয় শোক পালনে সরকার সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বিএনপি ইতোমধ্যে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আগামিকাল বুধবার বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

