বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ এর মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি নিধন যজ্ঞ। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে গেছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং ধারাবাহিক যোগসাজশের মাধ্যমে তাকে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে।
রোববার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম। হাদি হত্যা মামলার তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরতে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিনই সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতক ফয়সাল এবং তার মোটরসাইকেল চালক সহযোগী আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর থেকেই তাদের গ্রেপ্তারে সাভার, হেমায়েতপুর, আগারগাঁও এবং নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। অভিযানের এক পর্যায়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকা পর্যন্ত পুলিশের একটি চৌকস দল ধাওয়া দিলেও তার আগেই তারা দেশত্যাগে সক্ষম হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাদিকে হত্যার পর থেকেই আসামিরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে একটি ভাড়া করা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আমিনবাজারে পৌঁছায়। সেখান থেকে তারা কৌশলে মানিকগঞ্জের কালামপুর এলাকায় যায় এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করার আগেই তারা সীমান্ত রেখা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। এই পলায়ন প্রক্রিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক চক্রের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকায় ফিলিপ এবং সঞ্জয় নামে দুই ব্যক্তি তাদের গ্রহণ করার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। তারা আসামিদের অবৈধভাবে সীমান্ত পার করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ‘পুত্তি’ নামে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে পুত্তি তাদের সামী নামে এক ট্যাক্সি চালকের জিম্মায় দেয়, যে তাদের মেঘালয়ের তুরা নামক দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দেয়।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নজরুল ইসলাম আরও জানান, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে যে, ভারতের মেঘালয় পুলিশ ইতোমধ্যে পুত্তি ও সামীকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামিরা যেহেতু অবৈধ পথে সীমান্ত অতিক্রম করেছে, তাই তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের বিদ্যমান বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জব্দকৃত আলামতের তালিকায় রয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন, ধারালো অস্ত্র, একটি মোটরসাইকেল এবং আসামিদের ব্যবহৃত ভুয়া নম্বরপ্লেট। এছাড়া তদন্তে একটি বিশাল আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে ৫৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের বিপরীতে প্রায় ২১৮ কোটি টাকার সই করা চেক উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ বা ‘মোটিভ’ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শরীফ ওসমান বিন হাদি অত্যন্ত প্রখর এবং স্পষ্টবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক অবস্থানের পক্ষে জনমত গড়ে তুলছিলেন।
ধারণা করা হচ্ছে, ৫ আগস্টের ঘটনায় যারা রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারাই হাদিকে স্তব্ধ করে দিতে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। তদন্তের স্বার্থে অনেক প্রভাবশালীর নাম এখনই প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র লিপ্ত রয়েছে। মূল আসামি ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা গেলে নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা আরও সহজ হবে।
হত্যাকাণ্ডের দিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর পল্টন এলাকার বক্স কালভার্ট রোডে জুমার নামাজ শেষে ফেরার পথে হাদির ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। মোটরসাইকেলে আসা ফয়সাল চলন্ত অবস্থায় হাদিকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি ছুড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ হাদিকে সংকটজনক অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার ক্রমাগত অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে গত ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালীন ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই ঘটনায় গত ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। শুরুতে এটি হত্যাচেষ্টার মামলা থাকলেও হাদির মৃত্যুর পর আদালতের নির্দেশে তা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অর্থাৎ হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৬ জন আসামি ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং ৪ জন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিএমপি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ বদ্ধপরিকর বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

