দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে ফিরছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এখন এক উৎসবমুখর ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ‘বিজি-২০২’ ড্রিমলাইনার ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ডানা মেলেছে।
লন্ডন থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, তারেক রহমানের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন সহধর্মিনী ডা. জোবাইদা রহমান এবং একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। প্রায় ১৭ বছর আগে ২০০৮ সালে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে উন্নত চিকিৎসার লক্ষ্যে দেশ ছেড়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ এই নির্বাসনকালে তিনি লন্ডনেই অবস্থান করছিলেন এবং সেখান থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বুধবার বিকেলেই তিনি হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছান এবং প্রবাসীদের বিদায়ী শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে চেক-ইন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে আরও রয়েছেন তার মিডিয়া উইং প্রধান আবু আবদুল্লাহ সালেহ, ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুর রহমান সানি ও পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য তাবাসসুম ফারহানা। এছাড়া তাদের ব্যক্তিগত সফরসঙ্গী হিসেবে একটি বিড়ালও এই ফ্লাইটে বাংলাদেশে আসছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ইতিবাচক কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
তারেক রহমানের এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি অধ্যায়। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালে কারাবরণ এবং পরবর্তী সময়ে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমানোর পর এই প্রথম তিনি দেশে পা রাখছেন।
তার এই ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে শত শত প্রবাসী বাংলাদেশি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের আবেগঘন ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দলীয় টিকিট ছাড়াও অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক নিজেদের উদ্যোগে টিকিট সংগ্রহ করে একই ফ্লাইটে প্রিয় নেতার সঙ্গী হয়ে দেশের পথে রওনা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান ও তার পরিবারের জন্য টিকিট ক্রয় বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৮৫৬ ব্রিটিশ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ লাখ টাকার সমান। তবে ব্যয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতীক্ষার অবসান।
বিএনপি দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, তারেক রহমানকে বহনকারী ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার সকালে প্রথমে সিলেটে যাত্রাবিরতি করবে এবং এরপর বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। তার এই আগমনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ‘ডাবল লেয়ার’ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি দলীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন।
তারেক রহমানকে বরণ করে নিতে ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকার কুড়িল-পূর্বাচল সংলগ্ন ৩০০ ফিট এলাকায় ‘জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে’ বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে নেমে তিনি সরাসরি সেখানে সমবেত লাখ লাখ জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। এরপর তিনি যাবেন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে, যেখানে দীর্ঘ সময় পর তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার আবেগপূর্ণ সাক্ষাৎ ঘটবে।
দীর্ঘ এই নির্বাসনকাল শেষে তারেক রহমানের এই ফেরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় নির্বাচনে দলের অবস্থানকে সুসংহত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তার এই প্রত্যাবর্তনকে বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

