রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে কিশোর অপরাধ ও তথাকথিত ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ সংস্কৃতির এক ভয়াবহ রূপ সামনে এসেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতের শিকার হওয়া রোমান (১৫) নামে এক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মেনেছে।
সোমবার ভোরে মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং কিশোর গ্যাং বা এই জাতীয় উগ্র আচরণের ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
কামরাঙ্গীরচর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে পূর্ব রসুলপুরের ৭ নম্বর গলিতে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত রোমান ওই সময় গলির মোড়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। এমন সময় ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম সাগর সেখানে উপস্থিত হয়ে রোমানকে জেরা শুরু করে।
সাগরের অভিযোগ ছিল, রোমান কেন তাকে ‘সিনিয়র’ হিসেবে মান্য করছে না এবং কেন সে অন্য গলিতে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এই সামান্য বিষয় নিয়ে দুইজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সাগর উত্তেজিত হয়ে পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে রোমানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাগর প্রথমে রোমানের পেটে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে এবং পরবর্তীতে তার ডান হাতের বাহু ও বাম কবজিসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে।
কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম ফারুক জানান, হামলার একপর্যায়ে রোমান নিজের পেটের আঘাত ঢাকতে দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরলে, নিষ্ঠুর সাগর তার পিঠ দিয়ে আস্ত একটি ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। ছুরিকাঘাত করে সাগর দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
রক্তাক্ত অবস্থায় রোমানকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার পিঠে গেঁথে থাকা ছুরিটি বের করা হয়। তবে ২০ ডিসেম্বর রাতে তার শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা উন্নত চিকিৎসার আশায় তাকে মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন, সেখানেই সোমবার ভোরে তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
নিহত রোমানের বাবা জালাল ফকির বাদী হয়ে কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম সাগরকে গ্রেপ্তার করেছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ১৯ বছর বয়সী অভিযুক্ত সাগর নিজেও সান লাইট কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এবং তার বাবা একজন রিকশাচালক। ওসি গোলাম ফারুক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, রোমানের মৃত্যুর পর এখন আগের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে এবং আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে তথাকথিত ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা কিশোর ও তরুণদের বিপথে চালিত করছে। সামান্য সম্মান প্রদর্শন বা আড্ডার জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে খুনের মতো ঘটনা সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। কামরাঙ্গীরচরের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক শাসনের অভাব কিশোরদের হাতে অস্ত্রের জোগান ও অপরাধ প্রবণতাকে কতটা উসকে দিচ্ছে।

