“রাজধানীর বুকে দিবালোকে প্রকাশ্যে গুলি করে একজনকে হত্যা করা হলো, অথচ এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও খুনিরা ধরা পড়ল না। ঘাতকরা যদি এই সময়ের মধ্যে সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ পায়, তবে তা এই জাতির জন্য চরম লজ্জার বিষয়।” শনিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শহীদ শরীফ ওসমান হাদির জানাজা-পূর্ব বক্তব্যে এভাবেই তীব্র ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তাঁর বড় ভাই মাওলানা ড. আবু বকর সিদ্দিক। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্রের শেষ বিদায়ে অংশ নেওয়া লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর এই বক্তব্য এক আবেগঘন ও বিচারপ্রার্থিতার পরিবেশ তৈরি করে।
বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক তাঁর বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ঘটনার পর ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতকরা কীভাবে দেশ ছাড়ার সুযোগ পেল, সেই উত্তর আজ পুরো জাতি জানতে চায়। তিনি বলেন, “আমার কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই। আমার ভাই শরীফ ওসমান হাদি আজ শহীদ হয়েছে। শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা ওর নিজের মধ্যেই ছিল, যা আপনারা ওর বক্তব্যেও শুনেছেন। কিন্তু এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।” তিনি অবিলম্বে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
শনিবারের এই বিদায় অনুষ্ঠানটি ছিল শোক আর শ্রদ্ধার এক বিশাল মেলবন্ধন। সকাল থেকেই হাদির মরদেহ ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের বিশেষ পাহারায় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘর থেকে মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। সেখানে ময়নাতদন্ত শেষে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে পুনরায় মরদেহ হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এনে শেষ গোসল সম্পন্ন করা হয়। এরপর কফিনবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি যখন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার দিকে রওনা হয়, তখন রাস্তার দুই পাশে হাজারো মানুষকে অশ্রুসিক্ত নয়নে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বেলা আড়াইটায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বিশাল জনসমুদ্রে জানাজা শুরু হয়। জানাজায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ শরিক হন। জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল শোকের পাশাপাশি এক ধরনের ক্ষোভ। প্রিয় নেতার ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার বিচার চেয়ে উপস্থিত জনতা স্লোগান দিতে থাকেন। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে হাদিকে ‘নতুন বাংলাদেশের কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির অকাল প্রয়াণে আজ শনিবার বাংলাদেশে এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে। হাদির সম্মানে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। বিদেশের মিশনগুলোতেও শোকের আবহ বিরাজ করছে। জুলাই বিপ্লবের পর এটিই কোনো ছাত্রনেতার জন্য পালিত প্রথম রাষ্ট্রীয় শোক, যা হাদির গুরুত্ব ও তাঁর ত্যাগের মহিমাকেই ফুটিয়ে তোলে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে নির্বাচনী প্রচারণার সময় রিকশায় থাকা হাদির মাথায় গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। গত ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও গত বৃহস্পতিবার সেখানে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। জানাজা শেষে হাদির মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির সন্নিকটে দাফন করা হয়। হাদির ভাইয়ের এই আক্ষেপ এখন পুরো ছাত্র-জনতার দাবিতে পরিণত হয়েছে, যা ঘাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

