এক শান্ত ও শোকাতুর বিকেলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি সংলগ্ন প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অনির্বাণ শিখা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে দাফন প্রক্রিয়া শেষে এক হৃদয়বিদারক মোনাজাতের মাধ্যমে তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন শহীদ হাদির বড় ভাই এবং তার জানাজার ইমাম ড. আবু বকর সিদ্দিক। এ সময় কবির চত্বর ও আশপাশের এলাকায় সমবেত হাজারো মানুষের গুমরে কাঁদার শব্দে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে মোনাজাতে হাত তুলে ড. আবু বকর সিদ্দিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে মহান রবের দরবারে আরজি জানান। তিনি বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি আমার ভাই শরীফ ওসমান হাদিকে কবুল করে নিন এবং তাকে শহীদি মর্যাদা দান করুন। তার জীবনের সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। এই অপূরণীয় ক্ষতি ও শোক সইবার শক্তি আমাদের পরিবারকে দান করুন।” তার এই আকুল প্রার্থনা উপস্থিত সহযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
মোনাজাতে ড. আবু বকর সিদ্দিক কেবল তার ভাইয়ের জন্যই নয়, বরং যারা হাদির আদর্শের সাথী ছিলেন এবং যারা দেশের যে কোনো অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেই সব ছাত্র-জনতার জন্যও দোয়া করেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রার্থনা করেন, যেন হাদির রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের সংগ্রাম সাফল্যের মুখ দেখে। তিনি আল্লাহর কাছে তৌফিক প্রার্থনা করেন যেন হাদির স্বপ্নের ‘ইনকিলাব’ এ দেশের মানুষের মুক্তির দিশারি হিসেবে টিকে থাকে।
শনিবারের এই বিদায় অনুষ্ঠানটি ছিল মূলত জনসমুদ্রের এক মহাসম্মিলন। এর আগে দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় হাদির স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা লাখো মানুষ শরিক হন। জানাজা শেষে হাদির নিথর দেহ যখন কবির সমাধি চত্বরে আনা হয়, তখন এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ছাত্র-জনতা তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখতে ভিড় জমান।
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন নতুন প্রজন্মের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। গত ১২ ডিসেম্বর এক কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং দীর্ঘ ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফের লড়াইয়ে এক অপূরণীয় শূন্যতা। হাদির জীবন ও কর্ম নিয়ে উপস্থিত ছাত্ররা বলেন, তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে সত্যের পথে চলতে হয়। আজ তাকে আমরা সমাহিত করেছি ঠিকই, কিন্তু তার আদর্শ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রেরণা জোগাবে।
দাফন শেষে কবরের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা। তারা শপথ নেন যে, হাদি যে লক্ষ্য নিয়ে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার ও ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা রাজপথে অবিচল থাকবেন। সন্ধ্যার আবছায়া নেমে আসার আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ ও কবির সমাধি চত্বরে ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। সবাই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, এই চত্বর কাঁপানো প্রিয় মানুষটি আজ মাটির গভীরে চিরস্থায়ী আবাসে চলে গেছেন। হাদির এই মহাপ্রস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ত্যাগের মহিমা হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

