“প্রিয় ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি। তুমি আছো আমাদের হৃদয়ের গভীরতম প্রকোষ্ঠে। যতদিন এই মানচিত্র আর এই বাংলাদেশ টিকে থাকবে, তুমি প্রতিটি বাঙালির অন্তরে অম্লান হয়ে থাকবে।” শনিবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির জানাজা-পূর্ব এক আবেগঘন ভাষণে এসব কথা বলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
স্মরণকালের বৃহত্তম এই জানাজায় অংশ নিতে আসা লাখো মানুষের স্রোতের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ শুধু এখানে উপস্থিত জনসমুদ্রই নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশ এবং প্রবাসে থাকা কোটি কোটি মানুষের মন হাদির জন্য কাঁদছে। দেশ-বিদেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মানুষ আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে এই তরুণ বিপ্লবীর কথা ভাবছে। হাদি আমাদের কাছে কেবল এক ব্যক্তি নন, তিনি আজ এক অবিনাশী চেতনার নাম। তাই তাকে আজ বিদায় জানানোর কোনো অবকাশ নেই; বরং তিনি আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে মিলেমিশে গেছেন।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে শহীদ হাদির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, “আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি তোমার কাছে একটি পবিত্র ওয়াদা করতে। তুমি যে আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছো, যে সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের ডাক দিয়েছো, সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো না। শুধু আমরাই নই, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ তোমার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাবে। তোমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অমায়িক ব্যবহারের যে দৃষ্টান্ত তুমি রেখে গেছো, তা আজ সর্বজনবিদিত। আমরা সেই আদর্শকে অন্তরে লালন করবো এবং আমাদের কর্মের মাধ্যমে তা চির জাগ্রত রাখবো।”
শহীদ হাদির বিপ্লবী চেতনার কথা স্মরণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, হাদি জাতির কানে এমন এক মহামন্ত্র দিয়ে গেছেন যা বাংলাদেশ কোনোদিন ভুলবে না। বিদ্রোহী কবির কবিতার চরণের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “তোমার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই মন্ত্র ছিল— ‘বল বীর, চির উন্নত মম শির’। মাথা নত না করার যে দীক্ষা তুমি তরুণ সমাজকে দিয়ে গেছো, তা বাংলাদেশের প্রতিটি সন্তানের জন্মলগ্ন থেকে আমৃত্যু পাথেয় হয়ে থাকবে। আমরা বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করবো যে, আমরা এক আত্মমর্যাদাশীল জাতি এবং কারো কাছে আমাদের শির নত হবে না। এটিই হবে তোমার প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্মান।”
হাদির নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষা ও সুস্থ রাজনীতির চর্চা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বিশেষ আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, শহীদ হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন এবং প্রচারণার ক্ষেত্রে এক অনন্য ও আধুনিক মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। কীভাবে সাধারণ মানুষকে কষ্ট না দিয়ে, বিনীতভাবে তাদের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া যায় এবং একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যায়, তার শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন। হাদির এই শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যৎ রাজনীতিকরা হাদির প্রদর্শিত এই পথ অনুসরণ করে রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করবেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “হাদি, তুমি কোনোদিন হারিয়ে যাবে না। মহাকালের গর্ভে তুমি অমর হয়ে থাকবে। তোমার প্রতিটি কথা, প্রতিটি মন্ত্র আমাদের আগামীর পথ দেখাবে। আজকের এই দিনে তোমাকে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে আমানত হিসেবে সঁপে দিচ্ছি। আমরা তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমার দেখানো পথে হেঁটেই আমরা এই জাতির অগ্রগতি নিশ্চিত করবো।”
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে এক নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হন শরীফ ওসমান হাদি। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও গত বৃহস্পতিবার তিনি শাহাদাত বরণ করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম এই কারিগরের মৃত্যুতে দেশজুড়ে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার আজকের এই উপস্থিতি ও ভাষণ তাতে নতুন এক জাতীয় সংহতির মাত্রা যোগ করেছে। হাদির এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা।

