লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত নয়ন আর গগণবিদারী স্লোগানে বিদায় জানানো হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অকুতোভয় সেনানি ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদিকে। শনিবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যা জনসমাগমের দিক থেকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জানাজা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের কারিগর এই তরুণ নেতার শেষ বিদায়ে শামিল হতে রাজধানীর সব পথ যেন এসে মিশেছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মোহনায়।
শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষের মিছিল সংসদ ভবন এলাকার দিকে আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে জনস্রোত এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, দুপুর ১টার মধ্যেই সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার বিশাল দুটি মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
মানুষের এই ভিড় কেবল নির্দিষ্ট চত্বরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বিশাল রাজপথ ছাড়িয়ে উত্তর দিকে খামারবাড়ি ও আসাদগেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, উত্তর দিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (চীন মৈত্রী) পর্যন্ত শুধু মানুষের মাথার সারি দেখা গেছে। উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ভাষ্যমতে, এই জানাজায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সাত থেকে আট লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জানাজায় অংশ নেওয়া ৬৫ বছর বয়সী ধানমন্ডির বাসিন্দা ছিদ্দিকুর রহমান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমার দীর্ঘ জীবনে বহু জানাজায় অংশ নিয়েছি, কিন্তু এক তরুণ নেতার জন্য সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা ও বিশাল সমাবেশ আগে কখনো দেখিনি।
শহীদ হাদি আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন। মানুষ তার আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করেই আজ এখানে সমবেত হয়েছে।” একই অনুভূতির প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে মিরপুর থেকে আসা ৪২ বছর বয়সী মাসুদ রানার কণ্ঠেও। তিনি জানান, তার দেখা এটিই স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জানাজা।
বেলা আড়াইটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শুরু হয়। এতে ইমামতি করেন শহীদ হাদির বড় ভাই ও বিশিষ্ট আলেম ড. আবু বকর সিদ্দিক। জানাজার ঠিক আগে যখন হাদির ভাই তার ছোট ভাইয়ের স্বপ্ন ও ত্যাগের কথা বলছিলেন, তখন উপস্থিত লাখো মানুষের কান্নায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা সারিবদ্ধভাবে এই জানাজায় শরিক হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল-মত নির্বিশেষে এই বিশাল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, হাদি কেবল একটি সংগঠনের নেতা ছিলেন না, বরং তিনি জাতীয় ঐক্যের এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা হাদির মাথায় গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও গত বৃহস্পতিবার তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই সম্মুখ সারির সংগঠক ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ ও ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’-এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেমের এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
হাদির এই বিশাল জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল সন্ত্রাসবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক বিশাল গণবিক্ষোভ। জানাজা শেষে যখন তার মরদেহবাহী গাড়িটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তাকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল শোকের পাশাপাশি এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—শহীদ হাদির রক্ত যেন বৃথা না যায় এবং তিনি যে ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা যেন বাস্তবে রূপ পায়।

