অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানানো হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে। শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত তার জানাজায় অংশ নেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের লাখো জনতা।
শনিবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে কবির সমাধি চত্বরে হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন শহীদ হাদির বড় ভাই মাওলানা ড. আবু বকর সিদ্দিক।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানাজায় উপস্থিত হয়ে হাদির কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। জানাজা শেষে হাদির মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে হাজারো ছাত্র-জনতা স্লোগান দিতে দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে যাত্রা করে। বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে কবির চত্বরে মরদেহ পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাকে দাফন করা হয়।
হাদির মৃত্যু সংবাদে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই অকাল ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজ শনিবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। দেশের সকল সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে হাদিকে ‘নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, হাদির ত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং তার অসম্পূর্ণ কাজগুলো বাস্তবায়নের শপথ নিতেই আজ জাতি এখানে সমবেত হয়েছে। জানাজায় ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন মরহুমের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের সংগঠনের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন।
শরীফ ওসমান হাদির এই বিয়োগান্তক অধ্যায়ের সূচনা হয় গত ১২ ডিসেম্বর। ওইদিন দুপুরে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে নির্বাচনী প্রচারণারত অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা। একটি গুলি হাদির মাথায় বিদ্ধ হলে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ছয় দিন যমে-মানুষে টানাটানির পর গত বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ নেতা। শুক্রবার সন্ধ্যায় বিমান বাংলাদেশের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তার মরদেহ দেশে আনা হয়।
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন একাধারে একজন সংগঠক, রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠির নলছিটিতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলেন।
তার প্রতিষ্ঠিত ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম ও বিপ্লবের চেতনা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা তাকে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
হাদির জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহর জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সংসদ ভবন এলাকা থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের বিশেষ টহল নজর কেড়েছে। জানাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে হাদি দল-মত নির্বিশেষে কতটা জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি এবং তাদের বক্তব্যে হাদিকে আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম সেনানি হিসেবে অভিহিত করা হয়।
দাফন শেষে হাদির বড় ভাই ডা. আবু বকর সিদ্দিক উপস্থিত গণমাধ্যমের সামনে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করতে চেয়েছিল। তার আট মাসের শিশু সন্তানটি বাবার আদর না পেয়েই বড় হবে, এটি মেনে নেওয়া কঠিন।
তবে আমরা চাই না আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি হোক। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও প্রকাশ্য বিচার চাই।” হাদির সহযোদ্ধারাও একই দাবি তুলেছেন এবং তার আদর্শ বাস্তবায়নে অবিচল থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। দাফন শেষে উপস্থিত জনতা ও পরিবারের সদস্যরা বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করেন।

