বীরের রক্তে ভেজা লাল-সবুজের পতাকায় কফিনবন্দি হয়ে অবশেষে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়ক এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন তার নিথর দেহ বহনকারী বিমানটি ঢাকার আকাশে ডানা মেলল, তখন প্রকৃতিতেও যেন এক বিষণ্ণ শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় নেতাকে বরণ করতে বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলেন দীর্ঘদিনের রাজপথের সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন এক গুমোট ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
আজ সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শহীদ হাদির মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরেই তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং কফিনটি জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ হাদির এই মৃত্যুকে জাতীয় বীরের প্রস্থান হিসেবে অভিহিত করে অবিলম্বে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে একটি বিশেষ ফ্রিজার গাড়িতে করে হাদির মরদেহ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত পৌনে ৭টার দিকে মরদেহটি হাসপাতালের হিমাগারে (হিমঘর) পৌঁছায়। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ রাতে মরদেহটি সেখানেই সংরক্ষিত থাকবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে আজ রাতে সরাসরি মরদেহ দেখার সুযোগ থাকছে না। আগামীকাল সকালেই তাকে জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে প্রচারিত সর্বশেষ বার্তায় জানানো হয়েছে, শহীদ শরীফ ওসমান হাদির দ্বিতীয় নামাজে জানাজা আগামীকাল শনিবার (২০ ডিসেম্বর) দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন থেকে কিছু জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জানাজায় অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ব্যাগ, ভারী বস্তু বা সন্দেহভাজন সামগ্রী বহন না করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়াও আগামীকাল সংসদ ভবন ও এর আশপাশের পুরো এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শহীদ ওসমান হাদির এই মহাপ্রয়াণে শোকাতুর পুরো বাংলাদেশ। গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণাকালে আততায়ীর বুলেটে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর থেকে সারা দেশ তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন। তার মৃত্যুতে আগামীকাল শনিবার দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হবে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাদি কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নতুন বাংলাদেশের এক আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক সংগ্রামের প্রতীক।
সংসদ ভবনে জানাজা শেষে শহীদ হাদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে সমাহিত করার কথা রয়েছে। কবির ভাষায় ‘বিদ্রোহী’ এই তরুণ নেতা যেন কবির পাশেই খুঁজে নিচ্ছেন তার চিরস্থায়ী ঠিকানা। আগামীকালকের জানাজাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে এক বিশাল জনসমুদ্রের আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। আজ রাতের স্তব্ধতা যেন কেবলই আগামীকালের এক মহাপ্রস্থান অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি।

