সিঙ্গাপুরে সাত দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে বিজয়ী বেশে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলেন জুলাই অভ্যুত্থানের বীর সেনানি এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিশেষ ফ্লাইটটি (বিজি-৫৮৫) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয় নেতার নিথর দেহ বহনকারী কফিনটি যখন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করে, তখন বিমানবন্দরে উপস্থিত হাজার হাজার অনুসারী ও সাধারণ মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ শাখা থেকে হাদির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিমানবন্দরের ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে মরদেহটি বের করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ সময় পুরো বিমানবন্দর এলাকা জুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএন এবং আনসার সদস্যদের বিশাল বহর। তবুও প্রিয় হাদি ভাইকে শেষবারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষের ঢল সামলাতে বেগ পেতে হয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।
বিমানবন্দর থেকে শহীদ হাদির মরদেহ সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পরিবারের ইচ্ছায় এবং নিরাপত্তার খাতিরে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, তার মরদেহ আজ রাতে বারডেম জেনারেল হাসপাতাল অথবা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হতে পারে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামীকাল শনিবার (২০ ডিসেম্বর) বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদির এই বিয়োগান্তক প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি শহীদ হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের সকল দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া, তার স্মরণে আগামীকাল শনিবার দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই দিনটি উপলক্ষে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে এবং ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ মোনাজাত ও স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলও এই মেধাবী তরুণ নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও গতরাতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তার এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আজ সারাদিন রাজধানী ঢাকা ছিল উত্তাল। শাহবাগ, বায়তুল মোকাররম ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় বিক্ষোভকারীরা বিচার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিশেষ করে শাহবাগে ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচি থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কঠোর স্লোগান দেওয়া হয়।
হাদির মরদেহ দেশে আসার পর বিমানবন্দর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখী রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার এবং কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হাদি যে সংগ্রামের সূচনা করে গেছেন, তার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ছাত্র-জনতা রাজপথ ছাড়বে না। বীরের বেশে ফেরা শহীদ শরীফ ওসমান হাদি আজ কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নতুন চেতনার প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

