“হারাম খেয়ে আমি এত মোটাতাজা হইনি যে আমার জন্য বিশেষ কোনো কফিনের প্রয়োজন হবে! খুবই সাধারণ একটা কফিনে হালাল রক্তের হাসিমুখে আমি আমার আল্লাহর কাছে হাজির হব।” — ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বীর সেনানি শহীদ শরীফ ওসমান হাদির এই কালজয়ী উক্তিটি আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। মৃত্যুর পর আজ দুপুরে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি পোস্টের মাধ্যমে তার এই অন্তিম আকাঙ্ক্ষার কথা দেশবাসীকে জানানো হয়। পোস্টটির সাথে যুক্ত করা হয়েছে একটি সাধারণ কাঠের কফিনের ছবি, যা দেখে অগণিত মানুষের চোখে আজ জল ঝরছে।
শহীদ ওসমান হাদি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান ও পরহেজগার একজন মানুষ। তার এই সাদামাটা জীবনবোধ এবং পরকালের প্রতি অবিচল বিশ্বাস তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছিল। তার মৃত্যুর পর ভাইরাল হওয়া আরেকটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে নয়, আসমানে হয়। আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে, তার সন্তান লড়বে।” তার এই বাণীগুলো আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে সংগ্রামের নতুন পাথেয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানতেন সত্যের পথে চলতে গেলে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে, আর তাই তিনি নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রেখেছিলেন এক অমর ও গৌরবময় বিদায়ের জন্য।
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শহীদ ওসমান হাদির মরদেহ আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেশে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে মরদেহবাহী কফিনটি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা রয়েছে। যদি আবহাওয়া ও আকাশপথের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, তবে আজ সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইটটি অবতরণ করবে। সেখানে হাদির মরদেহ গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে তার পরিবারের সদস্য এবং ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
গত ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়া এই তরুণ নেতা দীর্ঘ কয়েকদিন যন্ত্রণার সাথে লড়াই করেছেন। প্রথমে ঢাকা ও পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও নিয়তির অমোঘ বিধানে গতকাল রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু সংবাদে সারা দেশে যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তা আজ এক বিশাল গণজাগরণে রূপ নিয়েছে। মানুষ তার ‘হালাল রক্তের হাসিমুখে’ আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষাকে এক অনন্য শাহাদাত হিসেবে দেখছেন।
শহীদ হাদির এই আত্মত্যাগ এবং তার রেখে যাওয়া আদর্শ নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। সাধারণ মানুষ বলছেন, হাদি তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে ন্যায়ের পথে থাকলে মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তার এই সাধারণ কফিনের ইচ্ছাটি মূলত ভোগবাদী ও সুবিধাবাদী রাজনীতির গালে এক চপেটাঘাত। দেশজুড়ে আজ যে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ চলছে, তার মূলে রয়েছে হাদির এই আপসহীন চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা। আগামীকাল শনিবার বাদ জোহর রাজধানী ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে লাখো মানুষের ঢল নামবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা এই তরুণ নেতার প্রস্থান জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে হাদির ভক্ত ও অনুসারীরা মনে করেন, হাদি মরে গিয়েও অমর হয়ে আছেন তার আদর্শের মাধ্যমে। তার কফিনটি হয়তো সাধারণ কাঠের হবে, কিন্তু সেই কফিনে শুয়ে থাকা মানুষটি আজ কোটি বাঙালির হৃদয়ে এক অসাধারণ স্থান দখল করে নিয়েছেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বিমানবন্দরের ভিড় বাড়ছে, সবাই অপেক্ষা করছেন তাদের প্রিয় হাদি ভাইকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য।

