রাজধানীর কেন্দ্রস্থল আজ এক অভূতপূর্ব বিক্ষোভের সাক্ষী হলো। নির্বাচনী প্রচারণারত অবস্থায় নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে মৃত্যুবরণ করা ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকা। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি হলো—হাদির খুনিদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার, দেশে বিদ্যমান সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বিগত ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১২ ডিসেম্বর, যখন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে ফিরছিলেন শরীফ ওসমান হাদি। প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত গুলিবর্ষণে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি দেখে উন্নত চিকিৎসার লক্ষ্যে গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েকদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করার পর গতকাল সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর সাথে সাথে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
আজ জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে ‘বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস’-এর ব্যানারে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটির মূল স্লোগান ছিল—‘শরীফ ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করো’। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো পল্টন ও মতিঝিল এলাকা। বিক্ষোভকারীরা এ সময় ‘আমার সোনার বাংলায় খুনি লীগের ঠাঁই নাই’, ‘ফ্যাসিবাদের আস্তানা এই বাংলায় হবে না’ এবং ‘আমি কে তুমি কে—হাদি হাদি’ এমন তীব্র শ্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনকারীদের কণ্ঠস্বরে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা এবং ন্যায়বিচার না পাওয়ার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, একজন রাজনৈতিক প্রার্থীকে দিনে-দুপুরে গুলি করার অর্থ হলো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গণতন্ত্রের ওপর নগ্ন আক্রমণ।
একই সময়ে খেলাফত মজলিসের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখাও পৃথক একটি প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। বায়তুল মোকাররম চত্বরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ছোট ছোট মিছিলগুলো এক সময় বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বক্তারা তাদের বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহলের ইন্ধনেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তারা দাবি করেন, দেশে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা সক্রিয় রয়েছে এবং তারাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে একের পর এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে হাদির প্রকৃত হত্যাকারীদের এবং এই ষড়যন্ত্রের পেছনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা না হয়, তবে ঢাকা শহরকে অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন নেতৃবৃন্দ।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বায়তুল মোকাররম ও এর আশপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের মূল লক্ষ্য হলো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা।
শরীফ ওসমান হাদির মরদেহ আজ সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেশে আনার কথা রয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানের একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে হাদির মরদেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করার কথা। সবকিছু ঠিক থাকলে ফ্লাইটটি আজ সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। সেখানে হাদির মরদেহ গ্রহণের জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, তার পরিবারের সদস্য এবং ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে আসার সময় বড় ধরনের শোক মিছিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে হাদির মৃত্যু নিয়ে গভীর শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একজন শিক্ষিত ও তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের এমন অকাল প্রয়াণকে দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নির্বাচনী ময়দানে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাদির মরদেহ আসার পর পরবর্তী জানাজা ও দাফনের সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। একই সাথে বিচার না পাওয়া পর্যন্ত তাদের এই রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আজকের এই বিক্ষোভ মিছিলটি শুধুমাত্র বায়তুল মোকাররমে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিবাদ মিছিলের খবর পাওয়া গেছে। প্রতিবাদকারীরা মনে করছেন, যদি প্রশাসন এই ঘটনার কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে অপরাধীরা আরও দুঃসাহসী হয়ে উঠবে। তাই সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এখন সরকারের সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে আছে। শরীফ ওসমান হাদির স্মরণে আজ সন্ধ্যায় অনেক জায়গায় গায়েবানা জানাজা ও মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচিরও ডাক দেওয়া হয়েছে। পুরো দেশ এখন এই তরুণ নেতার মরদেহের অপেক্ষা করছে, আর রাজপথ কাঁপছে বিচারের দাবিতে।

